)
Raima Islam Shimu Murder Case: পুরো ২৪ ঘণ্টা নিখোঁজ ছিলেন মঞ্চ-টেলি-সিনে কাঁপানো অভিনেত্রী! এবার ঝোপের মধ্য়ে এক বস্তায় মিলল টুকরো-টুকরো দেহ! হাড়হিম রহস্যমৃত্যুতে কেঁপে গেল ইন্ডাস্ট্রি।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ২০২২ সালের অভিশপ্ত ১৬ জানুয়ারি। সকাল ৭টায় শুটিংয়ের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ডাকসাইটে অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু। তাঁর ফোনে বহুবার কল করা হলেও কোনও উত্তর মেলেনি। এমনকী তিনি শুটিংয়ের লোকেশনেও পৌঁছননি। মিসিই ডায়েরি করা হয়েছিল। এরপর পুলিস ঢাকার অদূরে এক সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে এক বস্তা খুঁজে পেয়েছিল। সেই বস্তার ভিতেরেই ছিল রাইমার দ্বিখণ্ডিত দেহ! তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক জনপ্রিয় অভিনেতাকে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পুলিস গিয়েছিল একেবারে ঘরের কাছেই! পরিবারের ব্যবহৃত গাড়ির ভিতরেই! ফিরে দেখা যাক রাইমা ইসলাম শিমু হত্যা মামলার ‘ডার্ক সিক্রেট’! এরকম এক রবিবারেই তো নিখোঁজ হয়েছিলেন রাইমা!
রাইমা বাংলাদেশের বিনোদন দুনিয়ার অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন। যদিও তাঁর প্রারম্ভিক জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকী তাঁর জন্মসাল নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার’-এর তথ্যানুযায়ী রাইমা ১৯৭৭ সালে জন্মেছিলেন। অন্যদিকে বাংলা দৈনিক যুগান্তরের মতে তাঁর জন্ম ১৯৮৭ সালে। রাইমা নাটকের মঞ্চ থেকে তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন এবং পরে জাতীয় পুরস্কারজয়ী ফিল্মমেকার কাজী হায়াতের নজরে আসেন। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে নির্মাতা তাঁকে ‘বর্তমান’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালে রিলিজ হওয়া এই সিনেমার হাত ধরেই বড় পর্দায় রাইমার ডেবিউ। প্রায় ২৫টি বাংলাদেশি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন রাইমা। পাশাপাশি মঞ্চেও সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, তিনি প্রায় ৫০টি নাটকে অভিনয় করেছেন। এবং টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি রীতিমতো পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর অভিনীত শেষ সিনেমা ছিল ‘জামাই শ্বশুর’।
বিবাহিত জীবন ও ক্যামেরার নেপথ্যের জগৎ
বিনোদন জগতে কাজ করার সময়েই ঢাকার ব্যবসায়ী সাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে রাইমার পরিচয় হয়। তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ২০০৪ সালে তাঁরা বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর রাইমা সিনেমা থেকে সরে দাঁড়ালেও টেলিভিশনে কাজ চালিয়ে যান। তিনি বেশ কিছু অনুষ্ঠান প্রযোজনাও করেছিলেন। নিজের প্রযোজনা সংস্থা গড়ে তোলেন এবং এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিপণন বিভাগেও কাজ করতেন রাইমা। রাইমা-নোবেলের দু’টি সন্তান ছিল এবং তাঁরা ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় থাকতেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হত, রাইমা সিনেমা পরবর্তী জীবনে শান্ত জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু পরে তদন্তকারীরা তাঁর বাড়ির ভিতরে যা খুঁজে পেয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্পেরই ইঙ্গিত দেয়!
যে রবিবার তিনি নিখোঁজ হলেন
২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি ছিল রবিবার। নোবেলের মতে, সকাল ৭টার দিকে শুটিং করতে যাচ্ছেন বলেই রাইমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলে ন। কিন্তু তিনি সেখানে যাননি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাইমার বোন ফতেমা নিশা তাঁকে বারবার ফোন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। অবশেষে তিনি নোবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিলেন যে, তাঁর বোন কোথায় আছেন। নোবেল তাঁকে জানান, সকাল ৭টায় রাইমা শুটিংয়ের জন্য বেরিয়েছিল এবং এরপর থেকে তার কোনও খোঁজ নেই। এমনকী যে শুটিং স্পটে তাঁর যাওয়ার কথা ছিল, সেখানেও তিনি যাননি। সেই রাতে রাইমা আর বাড়িই ফেরেননি। ১৭ জানুয়ারি সকালে ফতেমা থানায় গিয়ে রাইমার জন্য জিডি করেছিলেন। পরে নোবেল কলাবাগান থানায় আরও একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। এরপরই কেরানীগঞ্জ থেকে সেই ফোনকলটি আসে। হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে এক সন্দেহজনক বস্তা পড়ে থাকতে দেখেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তাটি খুলতেই এক নারীর দু’টুকরো দেহ দেখে! শরীরে ছিল আঘাতের একাধিক চিহ্ন। ময়নাতদন্তের জন্য রাইমার দেহ মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাইমার ভাই শাহিদুল ইসলামকে ডাকা হয়েছিল দিদকে চেনার জন্য।
অভিনেতা জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ
এরপরই শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। পুলিস রাইমার আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী এবং তাঁর পেশাগত জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিজ্ঞাসাবাদ করে। একটি নাম তাৎক্ষণিক ভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশি অভিনেতা জায়েদ খানের নাম উঠে এসেছিল। শোনা যায়, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ নিয়ে কয়েক বছর আগেই রাইমা ও জায়েদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল। তদন্তকারীরা তাঁকে তাঁদের সেই বিবাদ এবং সাম্প্রতিক সময়ে রাইমার সঙ্গে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল কি না, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জায়েদ জানান, রাইমার সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল প্রায় দু’বছর আগে এবং এরপর আর কোনও যোগাযোগ ছিল না। এই সূত্র থেকে পুলিস কোনও উত্তরই পায়নি। এরপর তদন্তকারীরা আবার সেই ব্যক্তিদের কাছে ফিরে যান, যাঁরা রাইমাকে নিখোঁজ হওয়ার আগে দেখেছিলেন। তাঁরা নোবেল ও বাড়ির গৃহকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। দু’জনেই একই কথা বলেছিলেন—সকাল ৭টায় শুটিংয়ের জন্য রাইমা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু রাইমাদের গাড়ি নিয়ে সন্দেহ হয়েছিল পুলিসের।
ব্লিচিং পাওডারের গন্ধ
গাড়িটি রাইমা এবং তাঁর স্বামী নোবেল, দু’জনেই ব্যবহার করতেন। তদন্তকারীরা গাড়ি খোলার পর ভেতরে তীব্র এক গন্ধ পান। পুলিসের ধারণা হয়, গাড়িটি পরিষ্কার করতে এবং অপরাধের প্রমাণ লোপাট করার জন্য়ই ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর তাঁরা নাইলনের দড়ির একটি বান্ডিলও খুঁজে পান। রাইমার দেহ যে বস্তায় ভরা ছিল, সেটিও নাইলনের দড়ি দিয়ে সেলাই করা ছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন যে, গাড়ির ভিতর পাওয়া দড়িটির সঙ্গে বস্তায় ব্যবহৃত দড়ির কোনো যোগসূত্র আছে কি না। বিষয়টি ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। পরিবারের গাড়িটিই হয়তো রাইমার দেহ কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। শুটিংয়ের জন্য তাঁর বেরিয়ে যাওয়ার গল্পটি ধীরে ধীরে মিথ্যা প্রমাণিত হতে শুরু করে। পুলিস নোবেল ও তাঁর বন্ধু এসএমওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদ-সহ ছয় সন্দেহভাজনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তদন্তকারীরা জানান, ১৬ জানুয়ারি সকালে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে নোবেল শুরুতে একেক সময় একেক রকম কথা বলেছিলেন। পুলিশের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
যেভাবে রাইমাকে খুন
তদন্তকারীদের অভিযোগ, রাইমা আসলে শুটিংয়ের জন্য বাড়ি থেকে বেরই হননি! সকাল ৭টার দিকে রাইমা ও নোবেলের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। ঠিক যে সময়ে নোবেল দাবি করেছিলেন যে, রাইমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিবাদ এক পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করে। অভিযোগ, নোবেল প্রথমে রাইমাকে মারধর করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর তিনি ফরহাদকে বাড়িতে ডেকে পুরো ঘটনাটি জানান। পুলিলসকে খবর দেওয়ার পরিবর্তে ফরহাদ হত্যাকাণ্ড গোপন করতে এবং মরদেহ গুম করতে সহায়তা করতে রাজি হন বলেই অভিযোগ। বাড়িতে আরও একব্যক্তি ছিলেন, তিনি গৃহকর্মী। তদন্তকারীদের মতে, নোবেল তাঁকে জলখাবার কেনার জন্য বাইরে পাঠিয়েছিলেন। গৃহকর্মী চলে যাওয়ার পর ওই দু’জন মিলে রাইমার দেহ টুকরো টুকরো করেন, অবশিষ্টাংশ একটি বস্তায় ভরেন এবং নাইলনের দড়ি দিয়ে বস্তাটি সেলাই করে আটকে দেন। এরপর তাঁরা বস্তাটি পরিবারের গাড়িতে নিয়ে যান এবং গাড়ির বুটে লুকিয়ে রাখেন। মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে নোবেল ও ফরহাদ সেদিন বিকেলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন বলেই জানা যায়। কিন্তু তখনও দিনের আলো ছিল। ধরা পড়ার ভয়ে তাঁরা সেই প্রচেষ্টা থেকে সরে আসেন এবং বস্তাটি গাড়িতে রেখেই বাড়ি ফিরে যান। রাত ৯টার দিকে ওই দু’জন আবার বেরিয়ে পড়েন। এবার তারা কেরানীগঞ্জের দিকে গাড়ি চালিয়ে নির্জন কোনও জায়গার সন্ধানে বের হন। এক পর্যায়ে তারা হযরতপুর সেতুর আশপাশের এলাকায় পৌঁছান। পুলিস জানায়, সেতু থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ঝোপঝাড়ের মধ্যে বস্তাটি ফেলে রেখে তাঁরা ঢাকায় ফিরে আসেন। পরদিন সকালে নোবেল থানায় গিয়ে তার স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানায়। এর আগেই অবশ্য স্থানীয়রা বস্তাটি খুঁজে পেয়েছিল।
সহিংসতায় জর্জরিত দাম্পত্য জীবন
তদন্তকারীরা রাইমা-নোবেলের জীবন খতিয়ে দেখতে গিয়ে তাঁদের দাম্পত্যের গভীর সংকটের নানা অভিযোগের কথা জানতে পারেন। জানা যায়, নোবেল বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং রাইমার প্রতি ক্রমশ সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছিলেন। তিনি রাইমার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ তুলতেন এবং প্রায়ই তাঁকে মারধর করতেন। কোভিড-১৯ মহামারি পরিবারটিকে আরও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে ফেলে দেয়। শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাইমার টেলিভিশনের কাজ ব্যাহত হয়, আর নোবেলেরও ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। পরে কাজ আবার শুরু হলে রাইমাই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে ওঠেন। এই সময় তাদের মধ্যের আর্থিক টানাপড়েন ও কলহ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রাইমা তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ দায়ের করেছিলেন বলেও জানা যায়। দাম্পত্য জীবনের নানা সমস্যার কথা তিনি প্রায়ই তাঁর বোনের সঙ্গে শেয়ার করতেন। শারীরিক নির্যাতন ও অসুখী জীবন সত্ত্বেও তিনি সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছিলেন।
পুলিসি হেফাজত থেকে ফোনকল
হত্যার কয়েক দিন পর পুলিশ রাইমা ও নোবেলের মেয়ে ওজিয়া আলিম রিদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্তকারীদের কাছে সে জানায় যে, তাঁর বাবা প্রায়ই তাঁর মাকে মারধর করতেন। তাঁর জবানবন্দিতে মামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলির একটি উঠে আসে। হত্যার কথা স্বীকার করার পর নোবেল পুলিশি হেফাজত থেকে তাঁর মেয়েকে ফোন করেছিলেন। মেয়ের ভাষ্যমতে, তিনি তাঁর মাকে হত্যার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। রাইমা শুটিংয়ে গেছেন! এমন প্রচারের ফলেই প্রায় একদিন সময় পাওয়া গিয়েছিল, যা অভিযুক্তদের রাইমাকে খুঁজছেন এমন ভান করার সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় নিজেই এক ধরনের সূত্র তৈরি করে ফেলেছিল। ব্লিচিং পাওডার ব্যবহারের ফলেই গন্ধ থেকে গিয়েছিল। গাড়িতেই রয়ে গিয়েছিল দড়িটি। আর রাইমার বাড়ির বাইরে রাখা গাড়িটি তদন্তকারীদের সেই জায়গাতেই ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে তাঁর শেষ যাত্রার সূচনা হয়েছিল।
(Feed Source: zeenews.com)
