)
‘দেহদান বন্ধের কথা বলিনি, ব্রেন ডেথ হলে অঙ্গদান আগে জরুরি!’— নিউ টাউনের বক্তব্যের জেরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মুখে এবার যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে দাঁড়িয়ে ভুল ভাঙালেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। স্বাভাবিক মৃত্যু আর ব্রেন ডেথের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফারাক নিয়ে ঠিক কী ব্যাখ্যা দিলেন তিনি?
অয়ন শর্মা: ব্রেন ডেথ (Brain Death) এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম ফারাক বোঝাতে গিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে চাইলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। শনিবার যাদবপুরের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে প্লাস্টিক সার্জারি সংক্রান্ত একটি সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, দেহদান সম্পূর্ণ বন্ধ করার কথা তিনি কখনও বলেননি; বরং ব্রেন ডেথ বা মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে মরণোত্তর দেহদানের বদলে অঙ্গদানকে (Organ Donation) প্রাধান্য দেওয়ার কথাই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন।
বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?
গত বৃহস্পতিবার নিউ টাউনে চক্ষুদান সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, “দেহদান করে লাভ নেই। ওটা করবেন না প্লিজ।” সেখানে তিনি এআই বা কৃত্রিম প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, আমেরিকায় আধুনিক প্রযুক্তির জন্য শব ব্যবচ্ছেদের পাঠ অনেকটাই উঠে গিয়েছে। পাশাপাশি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর দেহদানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেছিলেন, বার্ধক্যজনিত মৃত্যুর আগে ব্রেন ডেথের সময়ে অঙ্গদান করা হলে তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরও বেশি কার্যকর হতে পারত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরপরই চিকিৎসকমহল, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ এবং সমাজকর্মীদের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান মঞ্চ যুক্তি দেয়, এআই বা থ্রি-ডি ইমেজিং প্রযুক্তি কখনও হাতে-কলমে অ্যানাটমি শেখার বিকল্প হতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য মানুষের শরীর ব্যবচ্ছেদ করা, গবেষণা ও কঙ্কাল প্রস্তুত করার গুরুত্ব অপরিসীম। তা ছাড়া মরণোত্তর দেহদান সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করারও এক বড় মাধ্যম।
শনিবারের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা:
বিতর্ক মাথাচাড়া দিতেই শনিবার কেপিসি মেডিক্যাল কলেজের মঞ্চ থেকে নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তিসহ ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুটি আলাদা পরিস্থিতির পার্থক্য তুলে ধরে তিনি জানান:
ব্রেন ডেথ বা মস্তিষ্কের মৃত্যুর ক্ষেত্রে যেসব রোগীর মস্তিষ্কের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (যেমন—হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি বা ত্বক) কৃত্রিমভাবে বা সাময়িকভাবে সক্রিয় রয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মৃত বলে ঘোষণা করার আগের ওই সময়টিতে অঙ্গদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক বা স্কিন ডোনেশনের মাধ্যমে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের উচিত ‘মরণোত্তর দেহদান’-এর বদলে ‘অঙ্গদান’-কে অগ্রাধিকার দেওয়া।
স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে যেসব রোগী স্বাভাবিকভাবে মারা যান, তাঁদের ক্ষেত্রে অঙ্গদানের কোনও সুযোগ বা মূল্য থাকে না। ঠিক এই পরিস্থিতিটিতেই মেডিক্যাল পড়ুয়াদের শিক্ষাসংক্রান্ত কাজের জন্য দেহদান অপরিহার্য ও অত্যন্ত উপযোগী।
নিজের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “দেহদানের অপ্রয়োজনীয়তার কথা কোনও সময় বলা হয়নি। খালি ব্রেন ডেড পেশেন্টের জন্য বলা হয়েছে তাঁদের অঙ্গদান আগে আসবে, দেহদান পরে।” তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষকে সচেতন করতেই এই পার্থক্যটি বলা হয়েছিল, তবে হয়তো কোথাও যোগাযোগের ভুল বা মিসকমিউনিকেশন তৈরি হয়েছিল।
(Feed Source: zeenews.com)
