
আর এই উন্মাদনার নেপথ্যে ছিলেন ৫৮ বছরের বিশ্বজিৎ চৌধুরী। একসময় বাঁকুড়া জেলা সাব-জুনিয়র দলের অধিনায়ক, কোল ইন্ডিয়ার চিফ ম্যানেজার, আর সর্বোপরি ফুটবলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এক মানুষ। কিন্তু যে মানুষটি বিশ্বকাপকে ঘিরে এত স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই মানুষটিই সপ্তমীর রাতে সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন। তাঁর সাজানো বাড়িতে আজও রয়ে গিয়েছে আবেগের স্মৃতি, শুধু নেই সেই মানুষটি।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নাম লেখা একটি দুর্লভ জার্সিও সযত্নে আগলে রেখেছিলেন। ২৮ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে তাঁর উত্তেজনা ছিল আরও বেশি। কলকাতা থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিলেন ৪০০টি ব্রাজিলের জার্সি। নিজের উদ্যোগে সেই জার্সি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা যেন আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বজিৎবাবু নিজেই বলেছিলেন, “বহুদিন আগে থেকেই বিশ্বকাপের আগে আমি এক্সাইটেড থাকি। আগে এগুলো খবর হতো না। নিজের প্যাশন আর নিজের উদ্যোগে করেছি। ছোট থেকেই আমি ব্রাজিলের ভক্ত। ফুটবলকে ভালবাসি। কলকাতা থেকে অর্ডার দিয়ে চারশো জার্সি আনিয়েছি। ব্রাজিলের ভক্তদের দিচ্ছি।” তাঁর এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মানুষটির সরলতা, আবেগ আর ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালবাসা।
কোনও প্রচারের প্রত্যাশা নয়, কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, প্রিয় দলকে ঘিরে নিজের আনন্দ অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। যে মানুষটি নিজের অর্থ, সময় আর ভালোবাসা দিয়ে অন্যদের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, তাঁর এই উদ্যোগ আজ আরও বেশি করে মনে পড়বে ফুটবলপ্রেমীদের। ব্রাজিলের পতাকায় সাজানো বাড়িটি তাই শুধুমাত্র বিশ্বকাপের প্রস্তুতির গল্প নয়, এক ফুটবলপাগল মানুষের আজীবনের ভালোবাসার দলিল।
কিন্তু সপ্তমীর রাতে আচমকাই নেমে এল অন্ধকার। স্ত্রী, দাদা-বৌদি এবং দীর্ঘদিনের পুরনো গাড়িচালককে নিয়ে তালডাংড়ার দিকে যাওয়ার পথে ছাগুলিয়ার কাছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাঁদের গাড়ি। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বিশ্বজিৎবাবুর দাদা। গুরুতর আহত অবস্থায় বিশ্বজিৎবাবু, তাঁর বৌদি এবং চালককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালে রাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী।
যে মানুষটি কয়েক দিন আগেও ব্রাজিলের পতাকা টাঙিয়ে বিশ্বকাপের স্বপ্নে মেতে ছিলেন, যাঁর হাত ধরে শত শত ফুটবলপ্রেমী পেয়েছিলেন প্রিয় দলের জার্সি, সেই মানুষটি আর কোনও দিন মাঠে নামবেন না, আর কোনও দিন বিশ্বকাপের আগে উচ্ছ্বাসে মাতবেন না। রবীন্দ্র সরণির সেই বাড়িতে হয়তো পতাকাগুলো এখনও উড়ছে, জার্সিগুলোও রয়েছে। কিন্তু নেই সেই মানুষটি, যাঁর ভালোবাসায় গোটা বাড়ি হয়ে উঠেছিল এক টুকরো ব্রাজিল। ফুটবল রয়ে যাবে, বিশ্বকাপও আসবে বারবার, কিন্তু বিশ্বজিৎবাবুর মতো একজন মানুষের শূন্যতা কোনও পতাকা, কোনও জার্সি, কোনও উল্লাস দিয়েই পূরণ করা যাবে না।
(Feed Source: news18.com)
