
বদরুল ইসলাম বিপ্লব, ঠাকুরগাঁও: খাদ্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এবার সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রোপো লাগানোর সময় একদফা সারের সংকটের পাশাপাশি এখন পরিচর্যা কালীন সময়ে আরেক দফা সারের সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। চলতি বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় তুলনামূলক বৃষ্টিপাত কম হয়।বেশিরভাগ কৃষক নিজস্ব শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি সেচ দিয়ে জমিতে রোপা রোপন করেন। তার উপর আমনের রোপা রোপনের সময় এমওপি সারের সংকট দেখা দেয়।৭৫০ টাকা দামের এমপি সার ১৮০০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয় চাষীদের।
নির্ধারিত দামের চাইতে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও এমওপি ও টিএসপি সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
সদর উপজেলার রামপুর গ্রামের কৃষক সাদেকুল ইসলাম নামে একজন কৃষক অভিযোগ করে বলেন, ‘ডিলারদের কাছে সার কিনতে গেলে বলে সার নেই।আর দামের চাইতে বেশি টাকা দিলে সার সরবরাহ করছেন।
নজিব উদ্দীন নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা পটাশ (এমওপি) সার এ বছর সোনার হরিন।অথচ এমওপি সার দিতে না পারলে রোপার থোড় গজাবে না।
সার ডিলাররা বলছেন, সরকারের নির্ধারিত দামেই আমরা সার বিক্রি করছি। কিছু খুচরা সার বিক্রেতা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন।এরকম ঘটনা ঘটায় রুহিয়ায় একজন খুচরা সার বিক্রেতাকে মোবাইল কোর্টে কারাদন্ড দেওয়া হয়।
সদর উপজেলার শিবগঞ্জ বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা আলম বলেন, ‘প্রায় দুই মাস থেকে পাইনি। তাই কৃষকরা সারের জন্য ভীড় করলেও এক কেজি সারও দিতে পারিনি।
আমন ধানের জমিতে চাহিদা মোতাবেক রাসায়নিক সার দিতে না পেরে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কায় হতাশ কৃষকরা।
এদিকে বিএডিসি’র ডিলাররা বলছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এমওপি সারের কোন বরাদ্দ না পাওয়ায় কৃষককে সার দিতে পারিনি।
গড়েয়া হাটের বিএডিসি’র সার ডিলার ওহিদুল ইসলাম শাহ বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি ও ডিএপি সারের বরাদ্দ দিলেও আমরা এমওপি সারের কোন বরাদ্দ পাইনি। তাই কৃষককেও পটাশ সার দিতে পারিনি।,
বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) শিবগঞ্জ ঠাকুরগাঁও বাফার গুদাম কার্যালয়ের তথ্য মতে, বর্তমানে এই গুদামে ইউরিয়া সারের মজুদ আছে সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বরাদ্দকৃত ইউরিয়া সার ৩ হাজার ৭২৪ মেট্রিক টনের মধ্যে ৩ হাজার ১০০ মেট্রিক টন সার ৬৩ জন ডিলারের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে ।
এছাড়াও ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ বিএডিসি’র উপ-সহকারী পরিচালক (সার) কার্যালয়ের সূত্র মতে, জেলায় বিএডিসি’র সার ডিলার মোট ১৪৯ জন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ৯৬৭ মেট্রিক টন টিএসপি ও ১ হাজার ৪৬ টন ডিএপি বরাদ্দকৃত সারের মধ্যে টিএসপি মজুদ আছে ৩৪১ দশমিক ৪৫ ও ডিএপি ৫৯১ দশমিক ০৫ মেট্রিক টন। সেপ্টেম্বর মাসে এমওপি সারের বরাদ্দ থাকলেও ১৯ তারিখ পর্যন্ত এমওপি সার গুদামে ছিল না। কিন্তু ২০ই সেপ্টেম্বরে এই গুদামে এমওপি সার মজুদ হয় ১৬৯ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন।
ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ বিএডিসি’র উপ-সহকারী পরিচালক (সার) জিল্লুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের বেশ কিছু দিন এমওপি সার ছিলনা ।বর্তমানে সার এসেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ডিলারদের বরাদ্দ দিলে তাদের এমওপি সার দিতে পারবেন।,
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় এবার আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লখ ৩৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমি ।কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অতিরিক্ত ১০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আব্দুল আজিজ জানান, পরিবহনের জন্য এমওপি সার সময় মতো আসতে না পারায় সংকট দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখন এমওপি সহ সকল প্রকার সার পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুদ রয়েছে।
এদিকে সময় মতো সার না পাওয়ায় আমন ধানের ফলনসহ আগাম সবজি নিয়ে হতাশায় ভুগছেন অনেক কৃষক।
সদর উপজেলার কৃষক ইউসুফ আলী ও আল আমীন বলেন, ‘সারের অভাবে ধানের গাছের চেহারা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোথাও সার পাচ্ছি না। এভাবে সার না পেলে আমরা চাষাবাদ কেমনে করবো। আর কিছুদিন গেলেই আবার আলু লাগাতে হবে। আলুতে তো আরও বেশি সার লাগবে ।বিশেষ করে পটাশ, ইউরিয়া ও টিএসপি সার। কিন্তু পটাশ ও টিএসপি সার তো এখনি পাওয়া যাচ্ছে না। সময় মতো সার না পেলে চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে হবে।
জ্বলানি তেল সহ সারের দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। এতো বেশি টাকা খরচ করে আমরা কৃষি কিভাবে করবো। আপনারা একটু আমাদের কৃষকদের দিকে দেখেন। সরকারের প্রতি অনুরোধ কৃষকদের সময় মতো যেন সার দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ কৃষি কর্মকর্তারা আমরা সার্বক্ষণিক সারের বাজার মনিটরিং করছি। তাই সার বেশি দামের বিক্রয়ের কোন সুযোগ নেই বলে দাবি করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ড. আব্দুল আজিজ ।তিনি আরও জানান, জেলায় সবজি ও আলু চাষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সার মজুদ রয়েছে।
সান নিউজ/এমআর
