
ঐশিক সেন
বরাবর উত্তর কলকাতার ছেলে আমি। শ্যামবাজারে বাড়ি, হিন্দু স্কুলে পড়াশোনা। ২০০২ সালে জীবনের মানচিত্র অনেকটা বদলে গেল। স্কুল পাশ করে কলেজ জীবনে পা দেব। কিন্তু যে কলেজে সুযোগ পেলাম, তা একেবারেই আমার পরিচিত বৃত্তের বাইরে। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। সেখানে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন নিয়ে পড়াশোনা। অপরিচিত স্থান, অপরিচিত আবহাওয়া, এমনকী কলেজটাও অপরিচিত। সেই হিসেবে তো সব কলেজই অপরিচিত। কিন্তু প্রেসিডেন্সি বা কলকাতার অন্যান্য কলেজ সম্পর্কে যা কানে আসত, সেটুকুও কখনও কানে আসেনি উত্তরবঙ্গের ওই কলেজ সম্পর্কে। থুড়ি, এসেছিল একবার, একটাই মাত্র কথা, তবে খুব সুখের নয় শুনতে – সেখানে নাকি খুব র্যাগিং হয়। এই আবহেই একরকম দুরু দুরু বুকেই কলেজ চত্ত্বরে প্রবেশ।
ইনটেকের দিন: কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে রুকরুকা নদী। চারটে বয়েজ হোস্টেল আর একটি গার্লস হোস্টেল। ইনটেকের দিনই প্রথম টের পেলাম সিনিয়রদের দৌরাত্ম্য। ৫ অগস্ট ইনটেকের দিন কার কোন হোস্টেলে বোর্ডিং হবে সেসব ঠিক করা হয়। সেদিনই প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হল কে কোথা থেকে এসেছে। আমি কলকাতা থেকে এসেছি শুনে আমার জন্য একজন ‘পোনা’ নিয়োগ করা হল। এই ‘পোনা’ সিনিয়রদের চলতি ভাষা। আমি হলাম তার ‘ছানা’। আমার ‘পোনা’ নিযুক্ত হল বাগবাজারের অঞ্জুদা (নাম পরিবর্তিত)। তার কী দায়িত্ব? প্রথমে আমাকে র্যাগিং করা! তার পর অন্য সিনিয়রদের র্যাগিংয়ের হাত থেকে বাঁচানো। সাধারণত যে এলাকার ফার্স্ট ইয়ার পড়ুয়া, সে এলাকারই সিনিয়রদের এই পদে নিযুক্ত করা হত। এই ‘পোনা’র প্রথম অধিকার র্যাগিং করার!
হোস্টেলের গল্প: বোর্ডিং হওয়ার পর নিয়ম, সিনিয়ররা র্যাগিং করতে এলে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে হবে। ফুল নয়, একটা করে কন্ডোম দিতে হত সিনিয়রদের। তার পর শুরু হত সেই ‘পোনা’র হাতে র্যাগিং। বরাবর র্যাগিংয়ের নানা দিক হয়। শারীরিক ও মানসিক দুইরকম। তবে প্রথম দিন র্যাগিংয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। নানারকম প্রশ্ন করছিল, কিছু মজার, আবার কিছু একেবারেই অশালীন, ছাপার অযোগ্য। প্রথম দিন উতরে গেলে পরের দিনগুলো আরও বিচিত্র র্যাগিংয়ের মুখে পড়লাম।
‘ব্রেন ওয়াশ’ ও অন্যান্য র্যাগিং: কলেজে ঢুকলে ফার্স্ট ইয়ার পড়ুয়াদের সবাইকেই একটা র্যাগিংয়ের মুখে পড়তে হত। সেটা হল ‘ব্রেন ওয়াশ’। এই র্যাগিংয়ে পড়ুয়াদের মাথাটা কমোডের মধ্যে ঢুকিয়ে ফ্ল্যাশ করে দেওয়া হত। এছাড়াও ছিল উলঙ্গ করে র্যাগিং। রাত বারোটা নাগাদ, জামাকাপড় সব খুলে ফেলতে হবে। শুধু অন্তর্বাস থাকবে পরনে। এর পর সারা ক্যাম্পাস জুড়ে ঘোরানো হবে। সিনিয়রদের ভাষায় এটি ছিল বিশেষ এক ধরনের প্যারেড।
মনে আছে, সেই সময় জলপাইগুড়িতে বেশ গরম। তার মধ্যেও সারাক্ষণ ফুলহাতা জামা ফুল প্যান্ট পরে থাকার নির্দেশ বড় দাদাদের। একদম গলার বোতামটাও আটকে রাখতে হবে। সে নিয়ম না মানলে শাস্তিও ছিল। একবার কোনও এক ভুলে গলার বোতাম খুলে ফেলেছিলাম। তার জন্য আমাকে ‘ইনভার্স র্যাগিং’ করা হয়। ‘ইনভার্স র্যাগিং’য়ে ভিতরের জামা অর্থাৎ অন্তর্বাস বাইরে পড়তে হয়, আর বাইরের জামা ভিতরে। আমাকে তাই পরে ক্যাম্পাসে ঘুরতেও হয়। শাস্তি সেটাই। আমার মতো আরও একজনকেও এই শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
মারধোরের হিসাব লেখা হত: কে কটা মার খাচ্ছে, তার হিসেব লিখে রাখার নিয়ম ছিল। বিভিন্ন গ্রুপ বানিয়ে র্যাগিং চলত। সবচেয়ে কুখ্যাত গ্রুপ ছিল ‘আল-কায়দা’ (এক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে নামের মিলটা নেহাতই কাকতালীয়!)। এদের র্যাগিং ছিল মারাত্মক। ওই গ্রুপের পড়ুয়াদের হাতে একটা কার্ড দিয়ে দেওয়া হত। সেই কার্ডে লিখে রাখা হত কে কটা চড়, লাথি, থাপ্পড় খেয়েছে। একজন করে সিনিয়র এসে গুণে গুণে মারত আর লিখে দিয়ে যেত কার্ডে। কোনও কোনও দিন এমন হয়েছে দাদারা এসে ৩০-৪০টা থাপ্পড় মেরেও কিছু লিখে দিয়ে যায়নি। আবার কেউ কেউ কিছু না করেই ৫০ টা চড় লিখে দিয়ে চলে গিয়েছে!
কলেজ প্রশাসন নিয়ে কিছু কথা: এই সব কিছুর পিছনে কলেজ প্রশাসন জড়িত ছিল না তা কিন্তু নয়। একটা ঘটনা বলি —আমার খুব কাছের এক বন্ধু বিতান (নাম পরিবর্তিত) বাঁকুড়া থেকে এসেছিল। এসব কিছুই বুঝত না। ওকে সে সময় পর্ন ভিডিয়ো দেখানো হয়। খুব ডিপ্রেসড হয়ে পড়ে। পর দিন ক্লাসে ফিজিক্সের টিচার সম্রাটবাবুকে (নাম পরিবর্তিত) জানাতে স্যর ওকে নিয়ে সোজা সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে যান। সেখানে কে র্যাগিং করেছে দেখাতে বলেন। দেখানোর পর সবাইকে বলেন, ওকে কেউ যেন আর র্যাগিং না করে! ভিক্টিমের পরিচয় এভাবে সামনে আনলে যা হতে পারে, তাই হল। ওই দিন বিকেল থেকে আরও বেশি র্যাগিংয়ের মুখে পড়ল বিতান। নি ডাউন অবস্থায় মানে হাঁটুর উপর ভর করেএকতলা থেকে তিনতলা চার-পাঁচবার উঠতে ও নামতে বাধ্য করা হয়।
ফার্স্ট ইয়ারে পড়ুয়ারা ভর্তি হলে হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু প্রথম সাতদিন র্যাগিংয়ের সময়ই তিনি বাড়ির সমস্যার কথা বলে ছুটি নিতেন। ফ্রেশার্স ওয়েলকাম হয়ে যাওয়ার পর আবার কলেজে আসতেন। ওই সময়টা হোস্টেল পুরো অসুরক্ষিত থাকত। র্যাগিং চলত প্রথম সাতদিন। ফ্রেশার্স ওয়েলকাম একবার হয়ে গেলে আর কোনও র্যাগিং হত না। কিন্তু ওই সাত দিন টিকে থাকাটাই যেন বিশাল বড় যুদ্ধ।
পুলিশ ও মিডিয়া এল যেবার: আমাদের পরের ব্যাচে প্রদীপ (নাম পরিবর্তিত) নামের এক পড়ুয়া ভর্তি হয় কলকাতা থেকে। মূলত তার র্যাগিংয়ের ঘটনাই জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের র্যাগিং সংস্কৃতি মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসে। আমাদের ব্যাচের দুটি ছেলে আর আমাদের থেকে দুই বছরের সিনিয়র দুজন মিলে তাকে র্যাগিং করে। অভিযোগ, সাইকেলের চেন দিয়ে মারা, ছুরি দিয়ে হাত কাটার মতো নৃশংস র্যাগিং করা হয় তাঁকে। সেই সময় আমি এজিএস (অ্যাডিশনাল জেনারেল সেক্রেটারি) ছিলাম। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ বা আমাদের কাছে খবর আসার আগে মিডিয়া জেনে যায়। কারণ ছেলের কাকা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বড় পদে ছিলেন। এর পর ব্যাপারটা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। খুনের চেষ্টায় জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করেন ছেলেটির বাবা। ২৬ দিন হাজতবাস করে ওই ‘দাদারা’। তবে কিছু দিনের মাথায় ছেলেটি কলকাতায় অন্য কলেজে সুযোগ পায়। ফলে তার বাবাও মামলা তুলে নেয়। মূলত, এই ঘটনার পর থেকেই র্যাগিং অনেকটা কমে যায় ক্যাম্পাসে। সিনিয়র, জুনিয়রদের হোস্টেল আলাদা করে দেওয়া হয়। ফার্স্ট ইয়ারের পড়ুয়া ভর্তি হওয়ার পর এক মাস পুলিশ পোস্টিং থাকত হোস্টেলে। আসলে র্যাগিং শুধু যাদবপুর নয়, দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই সমস্যা। প্রকাশ্যে আসে না বলে অনেকেই তা জানতে পারে না।লেখক বহুজাতিক আইটি সংস্থায় ম্যানেজার পদে কর্মরত
(Feed Source: hindustantimes.com)
