
৭ অক্টোবর সকালে গাজা থেকে প্যালেস্তিনীয় সংগঠন হামাসই প্রথম ইজরায়েলের উদ্দেশে রকেট ছোড়ে। কিন্তু আচমকাই হামলা করেনি হামাস, বরং গাজায় সীমান্ত ঘেঁষে, ইজরায়েলি সেনার চোখের সামনেই যুদ্ধের মহড়া হয়েছে, প্রশিক্ষণ চলেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে উঠে এসেছে। এমনকি দেশের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের তরফে বার বার সতর্ক করা হলেও, নেতানইয়াহু সরকার নির্বিকার থেকেছে বলে দাবি শোনা যাচ্ছে। দেশের নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, এই এক সপ্তাহে যা ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানি হয়েছে, তা অপূরণীয়। এই ক্ষত সারতে আগামী কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। আর তাতেই নেতানইয়াহুর অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুুলছেন তাঁরা।
একাধিক বার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ালেও, প্রকাশ্যে তাদের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে দাগিয়ে দিলেও, হামাসের বিরুদ্ধে এ যাবৎ মোটামুটি সহনশীল আচরণই দেখিয়েছে নেতানইয়াহু সরকার। কারণ প্যালেস্তাইনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাকি রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক তেমন ভাল নয়। তাই প্যালেস্তাইনের অন্দরে অস্থিরতা তৈরি করতেই হামাসের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা থেকে নেতানইয়াহু সরকার বিরত থেকেছে বলে মত সে দেশের রাজনীতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। ২০১৯ সালে দলীয় বৈঠকে হামাসকে সমর্থন জোগানোর কথা বলেছিলেন নেতানইয়াহু। তাঁর বক্তব্য ছিল, “প্যালেস্তাইনকে উৎখাত করতে গেলে হামাসের হাত শক্ত করতে হবে। অর্থসাহায্য দিতে হবে তাদের। গাজায় বসবাসকারী প্যালেস্তিনীয় এবং জুদেয়া ও সামারিয়ায় বসকারী প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে বিভাজন ঘটাতে হলে, এই কৌশল নিয়েই এগোতে হবে।”
তাই এই যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য নেতানইয়াহুর সেই অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধী থেকে রাজনৈতিক সমালোচকরা। গাজায় হামাসের উপস্থিতি জেনেও, সেখান থেকে সেনা সরিয়ে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে নিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শোনা যাচ্ছে, এ বছর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গাজার কাছে ইজরায়েলি সেনার মাত্র দুই ব্যাটেলিয়ন মোতায়েন ছিল। গত সপ্তাহে যুদ্ধের ঠিক আগে, গাজা সীমান্ত থেকে সেনা সরিয়ে পাঠানো হয় প্যালেস্তাইনের হুওয়ারায়, সেখানে বসবাসকারী ইজরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে। তাই গাজা সীমান্ত পেরিয়ে যখন ইজরায়েলি পরিবারগুলিকে পণবন্দি করতে শুরু করে হামাস, সেখানে তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পর্যাপ্ত ইজরায়েলি সেনা মোতায়েন ছিল না। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এক ইজরায়েলি নাগরিক বলেন, “এই যুদ্ধে কোথাও একটা তাল কেটেছে। দেশের সরকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বোঝাপড়া নেই আর আগের মতো। কারণ কথা ছিল, আমরা সীমান্ত পাহারা দেব, সরকার আমাদের পাহারা দেবে। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু ইজরায়েল সরকার নিজের দায়িত্ব পালন করেনি।”
নাগরিকদের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছে নেতানইয়াহু সরকারও। তাই এখন দোষারোপ করার সময় নয় বলে প্রচার করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-জিভির বলেন, “সবচেয়ে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ইজরায়েল। এটা প্রশ্ন তোলা, পরীক্ষা নেওয়া বা তদন্ত করার সময় নয়।” যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিরোধীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সরকার গড়ে তুলতে নেতানইয়াহু অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, বিরোধী পক্ষের নেতা বেনি গাঞ্জ প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, যুদ্ধ থিতিয়ে না আসা পর্যন্ত এই জোট সরকারে থাকবেন তাঁরা। আর এক বিরোধী নেতা ইয়ের লাপিদও শর্তসাপেক্ষে সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, যাতে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের অন্দরেই বিশৃঙ্খলা দেখা না দেয়। তাই নেতানইয়াহু সরকার যুদ্ধের জন্য হামাস, হেজবোল্লা, প্যালেস্তিনীয় নাগরিক এবং ইরানকে দায়ী করলেও, গোটাটাই ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা বলে দাবি করছেন রাজনৈতিক সমালোচকরা।
যুদ্ধ ঘোষণার আগে পর্যন্তও নেতানইয়াহু খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। দুর্নীতি মামলা যেমন তাড়া করে বেড়াচ্ছিল তাঁকে, গায়ের জোরে দেশের সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করা নিয়ে দেশ জুড়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনও শুরু হয়েছিল। অতি সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, নেতানইয়াহুর জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে নেতানইয়াহু জিততে পারবেন না বলে এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত আলোচ্য বিষয় ছিল দেশের সংবাদমাধ্যমগুলিতে। যুদ্ধ নেমে আসায় সেই কাটাছেঁড়ায় সাময়িক ছেদ পড়েছিল বটে, কিন্তু প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি যত বেড়ে চলেছে, আবারও নেতানইয়াহু এবং তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নেতানইয়াহুর সমর্থকের সংখ্যা যদিও কম নয়। কিন্তু আমেরিকা এবং পশ্চিমি দেশগুলির সহযোগিতায় যুদ্ধ যদিও বা সামাল দিতে পারেন, রাজনৈতিক ভাবে ইজরায়েলে ফের ক্ষমতায় ফিরতে নেতানইয়াহুকে বেগ পেতে হবে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহলও।
(Feed Source: abplive.com)
