
ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরের দিন ঝাড়গ্রাম থানার দ্বারস্থ হন সুরজের বাবা শশধর কোটাল। এরপরেই তৎপর হয় পুলিশ। মারামারি ও অপহরণের ধারায় মামলা শুরু হয়, ঝাড়গ্রাম থানায় মামলা রুজু হয়। এই মামলার কেস নম্বর ছিল ১০৪/২৩। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন থানার এস আই অসীম বোস।
প্রতীকী ছবি
রাজু সিং, ঝাড়গ্রাম: খুনের মামলায় ৮ জনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করল ঝাড়গ্রাম জেলা আদালতে। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সন্ধে ৭:৩০ নাগাদ ঝাড়গ্রাম থানার অন্তর্গত পুকুরিয়া এলাকায় অভিযোগ ওঠে কিছু ব্যক্তি মারতে মারতে সুরজ কোটাল নামে এক যুবককে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গিয়েছে।
সেই শেষ বারের মত দেখা গিয়েছিল বছর ২৩ এর সুরজ কোটালকে। ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরের দিন ঝাড়গ্রাম থানার দ্বারস্থ হন সুরজের বাবা শশধর কোটাল। এরপরেই তৎপর হয় পুলিশ। মারামারি ও অপহরণের ধারায় মামলা শুরু হয়, ঝাড়গ্রাম থানায় মামলা রুজু হয়। এই মামলার কেস নম্বর ছিল ১০৪/২৩। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন থানার এস আই অসীম বোস।
কিন্তু, দীর্ঘ তল্লাশির পরেও খোঁজ মেলেনি সুরজের। তবে, হাল ছাড়েন নি ঝাড়গ্রাম থানার পুলিশ। জায়গায় জায়গায় চিরুনি তল্লাশির পাশাপাশি সোর্সের সাহায্য নেওয়া হয়। কিছুদিন পর হঠাৎ খবর আসে অভিযুক্তদের মধ্যে একজন সঞ্জয় কোটাল ঘটনা সম্পর্কে কোনো এক জায়গায় কিছু তথ্য উল্লেখ করেছে যা আগে শোনা যায়নি। এরপরেই পুলিশি জেরায় দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে দোষ কবুল করে সঞ্জয়। উঠে আসে হাড় হিম করা এক নৃশংস ঘটনা।
সেদিন অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল সুরজের সঙ্গে আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে ঝামেলা হয় সঞ্জয় কোটাল,দুর্গা মল্লিক (ওরফে ভুক্তা), গৌতম মল্লিক, অজিত, কালু, পিন্টু, চুনারাম এবং অজিতের। ঝামেলা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছালে সুরজকে ঢেঁকিপুরা জঙ্গলের ভেতর মারতে মারতে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাপারটা খুব একটা নজরে আসেনি সাধারণ মানুষের। তারপর জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে নৃশংভাবে হত্যা করা হয় সুরজকে। সুরজের দেহ জঙ্গলের মধ্যে একটি কাজু গাছের নিচে পুঁতে ফেলা হয়।
সঞ্জয়ের বয়ানের ভিত্তিতে ৩০ এপ্রিল ২০২৩ সালে ওই কাজু গাছের নিচে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় সুরজের পচা গলা দেহ। এরপরেই ধীরে ধীরে ধরা পড়ে সেদিনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও ৭ জন। ঝাড়গ্রাম আদালতের অনুমতিতে কেসের সঙ্গে যুক্ত হয় হত্যার ধারাও। তদন্ত শেষ করে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করেন তদন্তকারী অফিসার। শুরু হয় বিচারপর্ব।
মৃত সুরজ কোটাল ঝাড়গ্রামের লোধা শবর সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। ঘটনার স্পর্শকাতরতাকে মাথায় রেখে সাক্ষীদের সময়মতো আদালতে হাজির করা, তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা থেকে শুরু করে বিচারের পুঙ্খানপুঙ্খ ধাপগুলি নজরে রাখতে শুরু করে ঝাড়গ্রাম জেলা ট্রায়াল মনিটরিং সেল। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ঝাড়গ্রাম থানার আই সি বিপ্লব কর্মকার ও তদন্তকারী টিম।
১৫ ফেব্রুয়ারী ঝাড়গ্রাম জেলা আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক, সুরজ কোটালকে অপহরণ করে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত ৮ জন কে আইনজীবীদের এবং তাদের উপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত বলে ঘোষণা করেন। ১৭ ই ফেব্রুয়ারী সোমবার সাজা ঘোষণা করা হয়। সোমবার ঝাড়গ্রামের জেলা এবং দায়রা আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অভিযুক্ত দুর্গা মল্লিক, সঞ্জয় কোটাল, গৌতম মল্লিক অজিৎ মল্লিক, কালু মল্লিক, চুনারাম মল্লিক, পিন্টু মল্লিক, অজিত মল্লিক- কে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন ।
বিচার পেয়েছেন সুরজ কোটাল এর পারিবার। নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছেন ঝাড়গ্রাম থানার আই সি বিপ্লব কর্মকারের নেতৃত্বাধীন তদন্তকারী টিম এবং ঝাড়গ্রাম জেলা পুলিশের ট্রায়াল মনিটরিং সেল।
