
নয়াদিল্লি: সভ্যতার খাঁড়া সবার আগে নেমে আসে তার উপরই। অথচ মানুষের দাবিদাওয়ার সামনে প্রকৃতির অধিকার বলে অবশিষ্ট থাকে না কিছুই। সেই আদিকাল থেকে এমনটাই চলে আসছে। ডিজিটাল স্বপ্নে বিভোর পৃথিবীতে আজও প্রতি মুহূর্তে বলি হচ্ছে প্রকৃতি। আর সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও নজির সৃষ্টি করল নিউজিল্যান্ড। পর্বতকে নাগরিক হিসেবে আইনি স্বীকৃত দিল সেদেশের সরকার। নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সমস্ত অধিকারও বুঝিয়ে দেওয়া হল। সেই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ মিলল এতকাল ধরে চলে আসা অন্যায়-অত্যাচারের। (Mount Taranaki)
নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত Mount Taranaki পর্বত। সেই পর্বতই এবার নাগরিক হিসেবে আইনি স্বীকৃত পেল। নয়া নাম হল Taranaki Maunga. জনজাতি মাওরি সম্প্রদায়ের ভাষাতেই এই নামকরণ হয়েছে। কারণ ৮ হাজার ২৬১ ফুট পর্বতটিকে নিজেদের পূর্বপুরুষ হিসেবে পুজো করেন মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষজন। তাঁরাই সরকারের কাছ থেকে পর্বতের নাগরিক স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন। (New Zealand Mountain Becomes a Person)
শুধুমাত্র নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিই নয়, আইনত Taranaki-র পরিচয় হয়েছে Te Kahui Tupua, অর্থাৎ সামগ্রিক ভাবে জীবিত ও অবিভাজ্য কেউ। Taranaki এবং তার সংলগ্ন শৃঙ্গ, পার্বত্য অঞ্চল, Te Urewera অরণ্য এবং Whanganui নদী অববাহিকাকে আইনি সংরক্ষণ দেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে নাগরিক স্বীকৃতি। Taranaki-র অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়েছে মাওরি সম্প্রদায় এবং স্থানীয় চার বাসিন্দাকে। আরও একটি নতুন সংগঠন থাকবে, যারা Taranaki পর্বতের কণ্ঠ এবং মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
জনজাতি মাওরিদের উপর শোষণ চালিয়ে, শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা নিউজিল্যান্ডে উপনিবেশ গড়ে তোলে। বর্তমানে আদি বাসিন্দা মাওরিদের তুলনায় ইউরোপীয়দের জনসংখ্যাই বেশি সেখানে। মাওরিদের অভিযোগ, তাঁদের মাটিতে দখলদারি কায়েমের পাশাপাশি, Taranaki পর্বতটিও চুরি করে নেওয়া হয়। নয়া চুক্তি অনুযায়ী, সেই চুরি এবং শোষণের ক্ষতিপূরণ দিতেও সম্মত হয়েছে নিউজিল্যান্ডের সরকার।
নয়া চুক্তি অনুযায়ী, পর্বতের উপর মাওরিদের অধিকার কায়েম থাকবে। তার স্বাস্থ্য, সুস্থতা, সবকিছুর খেয়াল রাখবে মাওরি সম্প্রদায়। পর্যটকদের কাছে Taranaki বেশ জনপ্রিয়। হাইকিং থেকে স্নো স্পোর্টস, রোমাঞ্চের স্বাদ পেতে ছুটে যান বহু মানুষ। আপাতত সেই সব বন্ধ না করা হলেও, ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকে নজর রাখবে মাওরি সম্প্রদায়।
সরকার এবং মাওরিদের মধ্যে এই চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেন দেশের সাংসদ পল গোল্ডস্মিথ। তিনি বলেন, “ওই পর্বত আসলে শ্রদ্ধেয় অভিভাবক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ভরণপোষণের উৎস, চিরনিদ্রার স্থান।” Te Pati Maori দলের নেত্রী ডেবি নগারেওয়া-প্যাকার, Taranaki জনজাতি সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকারী। তিনি বলেন, “এতদিনে অবিচার এবং বর্বরতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হল পর্বতটি।”
সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় জনসংখ্যার সামনে কোণঠাসা হতে হতে মাওরিরা কার্যত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। নিজেদের অধিকার, দাবিদাওয়া বুঝে নিতে সরব হয়েছেন তাঁরা। গত বছর নভেম্বরে সংসদ ঘেরাও করেন মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষজন। ১৮ এবং ১৯ শতকে মাওরি সম্প্রদায়ের থেকে ওই পর্বতের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয় কার্যত। ইংরেজ নাবিক ক্যাপ্টেন জেমস কুুক নিজের জাহাজ থেকে Taranaki পর্বতের শৃঙ্গটি দেখতে পান। তিনি পর্বতশৃঙ্গের নামকরণ করেন Mount Egmont. ১৮৪০ সালে মাওরি জনজাতি এবং তদানীন্তন ইংরেজ সরকারের মধ্যে নিউজিল্যান্ড প্রতিষ্ঠা চুক্তি হয়, যার আওতায় মাওরিদের অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি ইংরেজরা। ১৮৬৫ সালে পর্বত সংলগ্ন জমির উপর দখল কায়েম করে সেখান থেকে মাওরিদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী এক শতক সেখানে কথা বলার অধিকারই ছিল না মাওরিদের। পর্যটকরা সেখানে ঘোরাফেরার অধিকার পান, শিকার করার অনুমতি পান শিকারিরা। কিন্তু মাওরি সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে নিজেদের আচারানুষ্ঠান পালনের অধিকার পাননি। সাত এবং আটের দশকে এর পর বৃহত্তর আন্দোলনে শামিল হন মাওরিরা। নিজেদের ভাষা, নিজেদের সংস্কৃতি এবং নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামেন সকলে। মাওরিদের ওই অঞ্চলের জমির উপর বসতি স্থাপনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে ২০২৩ সালে নতুন করে চুক্তি হয়, বরাদ্দ হয় কোটি কোটি টাকা।
(Feed Source: abplive.com)
