
নিবেদিতা হাজরা, লস অ্য়াঞ্জেলস:
আমেরিকাতে এখন পুজো হয় হইহই করে, অন্তত তেমনটাই আমরা দেখি ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ফেসবুক পোস্টে। বর্তমানের মার্কিন মুলুকের অর্থনৈতিক মন্দা, চাকরীর বাজারে চরম অনিশ্চয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অথবা ভিসার কড়া চোখরাঙানি, নানাবিধ কারণকে উপেক্ষা করে দেশের পুজোর সাধ নিতে যাওয়া হয়ে ওঠেনা অনেকেরই, তাই মানুষ নিজের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেয় কিংবা নেওয়ার চেষ্টা করে পরবাসেই।
সময়ের সাথে স্বাভাবিক নিয়মে পুজোর সংখ্যা বেড়ে চলেছে এক এক করে। শুধু ক্রমবর্ধমান লোক সংখ্যাই পুজোর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয় । বিতর্ক-মতপার্থক্য-ইগো-অভিমান এর লড়াই তো সারাবছর থাকে, পুজোর কটা দিন ভুলে থাকাই যায় । সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পুজো হয় আমেরিকার নিউ জার্সি কিংবা নিউ ইয়র্ক শহরে, হাডসনের পারে বাঙালির পুজো পরিক্রমা আপনাকে অনায়াসে মনে করিয়ে দেবে দেশের পুজোর কথা, আর মুকুটে নতুন পালক টাইম স্কোয়ারের পুজো উদযাপন আর উন্মাদনা।
এদিকে আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্টও পিছিয়ে নেই। হলিউডের আশেপাশের পুজোগুলোর মধ্যে বেশ জনপ্রিয় কয়েকটি পুজো হল ভিবিসির পুজো, বিএএসসির পুজো কিংবা দক্ষিণীর পুজো। পুজোর সময় দেশে যেমন নতুন বাংলা সিনেমা রিলিজ নিয়ে হইহই চলে , প্রবাসের পুজো গুলোর তেমন অন্যতম মূল আকর্ষণ হল দেশ থেকে আসা শিল্পীদের প্রোগ্রাম।
যে কয়েকজন শিল্পী প্রতিবছর নির্বাচিত হন আমেরিকার বিভিন্ন বাঙালি পুজো মণ্ডপে পারফর্ম করার, তারা এই কয়েকটি দিন বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে অনুষ্ঠান করে “ডোমেস্টিক ফ্লাইট-হোটেল-পুজো মণ্ডপ” কে ডেইলি রুটিনে বানিয়ে ফেলেন । যেমন এবছর বাঙালির “রক-ভগবান” রূপম ইসলাম যেদিন “হাসনুহানার” সুবাস ছড়াবেন নিউ জার্সির জিএসপিসির পুজো মণ্ডপে , ঠিক তার পরেই ছয় ঘণ্টা উড়ে চলে আসবেন আমেরিকার এক্কেবারে পশ্চিম প্রান্তে, একদিন পরেই “নীল রং ছিলো ভীষণ প্রিয় “ র সুরে কলেজ প্রেমে ফিরে যাবে মিডল-স্কুলে পড়া ছেলেটির মা কিংবা দিনরাত অফিস ল্যাপটপে কোডিং লিখে লিখে ক্লান্ত বছর তেতাল্লিশের ছেলেটি।
যতই বিতর্ক চলুক জাতীয়তাবোধ-প্রাদেশিকতা নিয়ে, বাংলা ভাষার অস্তিত্ব নিয়ে , বাঙালির কোনো অনুষ্ঠানই আজ সম্পূর্ণ হয় না বলিউডি মেজাজ কে বাদ দিয়ে । তাই বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মধুবন্তী বাগচী যেদিন ভিবিসির পুজো মণ্ডপ মাতাবেন “উই-আম্মা” র মাদকতায়, ঠিক তার পরের সপ্তাহেই আমেরিকার সুদূর দক্ষিণের ফ্লোরিডার ট্যাম্পার সৈকতের পুজো মণ্ডপ মাতাবেন । কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমরা যেন ভুলে না যাই “কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া” গানটির ফিমেল ভার্সন টিও উনি গেয়েছেন, তাই তিনি না গাইলেও দর্শক আসন থেকে একজনও যেন অনুরোধ করেন সেই গান গাওয়ার । শুধু দুগ্গা মার আরাধনাই নিজেদের বাঙালিয়ানা প্রকাশ করেনা, আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে যায় প্রতিমুহূর্তে । আর যেই মানুষটি বর্তমান সঙ্গীত জগতে একটু নতুন ধারা তৈরী করেছেন, বাঙালি তরুণ প্রজন্ম
যাকে নতুন আইকন হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে সেই অনুপম রায় এই বছর তার “আগমনী সুর“ ছড়িয়ে দেবেন কখনও আটলান্টার পুজো তে, কখনও লস অ্যাঞ্জেলেস এর প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় “দক্ষিণী” র পুজোতে । শিউলি আঁকা ব্লাউজ কিংবা “হলুদ ট্যাক্সি-ভিক্টোরিয়া-দ্বিতীয় হুগলী সেতু” রা রঙিন সুতোর কারুকার্যে বন্দি হয়ে যায় বাঙালির মেয়েদের শাড়িতে, তবে দশমীর সাজটা আজও চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে যায় নান্দনিক ট্র্যাডিশনাল লাল সাদাতেই , পুরুষেরা কিংবা খুদেরাও পিছিয়ে থাকে না।
সারাবছর রাতভোর কাজের চাপে বুঁদ হয়ে ফ্রিজের লেফ্টওভার খাবারে কিংবা চটজলদি স্যালাড আর গ্রিলড চিকেনে দিন কাটলেও এই দু তিনটে দিন দুবেলা ভরপেট খিচুড়ি ভোগ-লাবরা-পাঁঠার মাংসের ঝোল-রুইমাছের কলিয়া-বিরিয়ানিরা যখন থালাকে সুসজ্জিত করে, তখন যন্ত্রের মতো চলতে থাকা জীবনও নতুন করে অক্সিজেন খুঁজে পায় । আর খেতে খেতে যদি রায়-ঘটক-সেন কিংবা সুমন-অঞ্জন-নচিকেতা কিংবা কিশোর-রফি-পঞ্চম অথবা লাল-গেরুয়া-সবুজ বা কোহলি-ধোনি-শর্মা নিয়ে একটু আড্ডা মারার সুযোগ পাওয়া যায় তাহলে তো পুজো জমজমাট , অনভ্যস্ত গুরুগম্ভীর খাবারও হজম হয়ে চোখের নিমেষে জেলোসিল ছাড়াই।
এদিকে প্রবাসে বাঙালি যখন নিজের মতো করে মেতে উঠেছে, ওদিকে কার্তিক সিলিকন ভ্যালির জিম থেকে চুল উড়িয়ে বেরিয়ে দুগ্গা মা কে বললো এবার একটা “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স” এর কোর্স করেই কৈলাস ফিরবে কখন কি দরকার পরে, লক্ষ্মী ওদিকে ম্যানহাটনে ছুটেছে একটা “এলভি” আর “গুচি” র কালেকশনের উদ্দেশ্যে, অধুনা শাড়ির পকেটে হালকা চাপ ফিল করায় দুগ্গা মা যখন সরস্বতীর দিকে তাকালো, তৎক্ষণাৎ সরস্বতী মা কে ভরসা দিয়ে বললো “ ডোন্ট ওরি মা, আমি সোনাঝুরির ৭০০ টাকার কালেকশনেই খুশি “, আজকাল গণেশও ক্যালোরি কনশাস, তাই ওই রেগুলারের লাড্ডু ছেড়ে ভালো থাইসুপ এর খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে টেক্সাস টু বোস্টন ।
(Feed Source: zeenews.com)
