আফ্রিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত সমুদ্রে খেলে বেড়াচ্ছে বিরাট ‘বাদামি সাপ’! মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে! কীসের সংকেত?

আফ্রিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত সমুদ্রে খেলে বেড়াচ্ছে বিরাট ‘বাদামি সাপ’! মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে! কীসের সংকেত?

 

৮,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাদামি সাপ এখন দুঃস্বপ্ন! জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি বর্জ্য, আর সমুদ্রের উষ্ণতা মিলে তৈরি করেছে এক ভয়াবহ সাগর দানব, যা শুধু সমুদ্রের প্রাণ নয়, মানবজীবন ও অর্থনীতিকেও বিপদে ফেলছে।

আফ্রিকা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ৮,৮৫০ কিমি লম্বা ‘বাদামি সাপ’! মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ দৃশ্য! কী হচ্ছে জানেন?

এই অদ্ভুত, অথচ ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দৃশ্য এখন চিন্তায় ফেলেছে বিজ্ঞানীদের। আফ্রিকার উপকূল থেকে শুরু করে মেক্সিকো উপসাগর পর্যন্ত প্রায় ৮,৮৫০ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এক বিশাল বাদামি শৈবালের বেল্ট, যা মহাকাশ থেকেও স্পষ্ট দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন Great Atlantic Sargassum Belt (GASB)।

এটি কোনও ছোট স্তর নয়, বরং ৩৭.৫ মিলিয়ন টন ওজনের এক বিশাল ‘শৈবাল দানব’, যা এখন পরিবেশ এবং মানুষের জীবনের জন্য এক গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে।

প্রথম ২০১১ সালে এই বেল্ট শনাক্ত হয়, তারপর থেকে এটি প্রতি বছর আকারে দ্বিগুণ হতে থেকেছে। এখন এর দৈর্ঘ্য প্রায় সমগ্র আমেরিকা মহাদেশের সমান।

🪸 সারগাসাম কী, আর কেন এত বিপজ্জনক? Sargassum হল এক ধরনের ভাসমান সাগরশৈবাল, যা আগে কেবল Sargasso Sea অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটি সাধারণত জলের ওপর ভেসে থেকে ছোট মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য আশ্রয়স্থল তৈরি করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই শৈবাল নিজের সীমা ভেঙে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এখন এটি দ্রুত বাড়ছে উষ্ণ ও পুষ্টি-সমৃদ্ধ জলে—বিশেষ করে যেখানে নদীগুলি কৃষিক্ষেত্রের বর্জ্য, শিল্পকারখানার নির্গমন ও নর্দমার মাধ্যমে প্রচুর নাইট্রোজেন ও ফসফরাস সমুদ্রের দিকে বয়ে নিয়ে যায়।

⚠️ বৈজ্ঞানিক সতর্কতা: ৪০ বছরে নাইট্রোজেন বেড়েছে ৫৫% Florida Atlantic University-র Harbor Branch Oceanographic Institute-এর গবেষণায় জানা গিয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারগাসামের মধ্যে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫৫%, আর নাইট্রোজেন-ফসফরাস অনুপাত বেড়েছে ৫০%। এর মানে হল—এই শৈবাল এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই পুষ্টি বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উৎস হল আমাজন নদী, যা কৃষি ও শিল্পবর্জ্যে ভরা জল সমুদ্রের দিকে বয়ে নিয়ে যায়। পরে Gulf Stream ও Loop Current নামের স্রোতগুলো সেই ‘বাদামি ফিতা’-টিকে আটলান্টিক পেরিয়ে মেক্সিকো পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।

এই বিশাল শৈবাল বেল্ট সামুদ্রিক জীবনের জন্য এক বিরাট হুমকি। যখন এটি জলের উপরে জমে, তখন সূর্যের আলো নিচের প্রবালপ্রাচীরে পৌঁছতে পারে না, ফলে ফটোসিন্থেসিস বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কার্বন সিঙ্ক বা সমুদ্রের কার্বন শোষণ প্রক্রিয়াও।

আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হল—যখন এই শৈবাল পচতে শুরু করে, তখন তা থেকে নির্গত হয় হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। উপকূলে জমে গেলে এর দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত গ্যাস মানুষের শ্বাসযন্ত্র ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে।

এই শৈবাল শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতির উপরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সমুদ্র সৈকতে এটি জমে গেলে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাছধরা বন্ধ হয়ে যায়, এবং পরিষ্কারের খরচ বেড়ে দাঁড়ায় লক্ষ লক্ষ ডলার।

১৯৯১ সালে ফ্লোরিডার উপকূলে এত বিশাল পরিমাণে সারগাসাম জমেছিল যে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি ‘সী-উইড’ নয়, বরং এক সম্পূর্ণ পরিবেশ-অর্থনৈতিক সংকট।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, জলবায়ু পরিবর্তনই এই বিশাল শৈবাল বেল্টের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা সৃষ্টি করেছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারগাসামের বৃদ্ধি আরও দ্রুত হচ্ছে। পাশাপাশি, বাতাসের দিক ও সমুদ্রস্রোতের পরিবর্তন একে এখন আরও উত্তরে ঠেলে দিচ্ছে।

যদি দ্রুত কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই ‘Sargassum Monster’ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো ক্যারিবিয়ান ও আমেরিকার উপকূল অঞ্চলকে ঢেকে ফেলতে পারে।

৮,৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাদামি শৈবালবেল্ট এখন এক বাস্তব পরিবেশগত দুঃস্বপ্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি বর্জ্য, আর সমুদ্রের উষ্ণতা মিলে তৈরি করেছে এক ভয়াবহ সাগর দানব, যা শুধু সমুদ্রের প্রাণ নয়, মানবজীবন ও অর্থনীতিকেও বিপদে ফেলছে।

(Feed Source: news18.com)