
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। টাকা খাটাতেন শেয়ার বাজারেও। চলতি বছরের শুরুতে শেয়ার ভাঙিয়ে ৫০ কোটি টাকা পেয়েছিলেন। সম্প্রতি মুম্বইনিবাসী ৭২ বছরের সেই বৃদ্ধকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তাঁর কাছ থেকে ৫৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। তদন্তে নেমে জানা গিয়েছে, ৪০ দিন ধরে বৃদ্ধকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করে রেখে তাঁর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেই টাকা লেনদেন করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের ৬,৫০০-রও বেশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট মারফত! এমনই ঘটনা ঘটেছে খাস দেশের বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে। এই ঘটনাকে দেশের অন্যতম বড় সাইবার প্রতারণা বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।
মুম্বই পুলিস আন্তঃরাজ্য সাইবার প্রতারণা চক্রের ছয় সদস্যকে গুজরাট থেকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা ৫৮ কোটি টাকার একটি বিশাল জালিয়াতির সাথে জড়িত ছিল। এই চক্রটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা সেজে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত। প্রধান অভিযুক্ত, যুবরাজ, চিন ও কম্বোডিয়ার প্রতারকদের সাথে যোগাযোগ রেখে কাজ করত।
প্রতারণা চক্রের মূল তথ্য:
গ্রেফতার: মুম্বই পুলিসের একটি দল গত কয়েক দিনে গুজরাটের মেহসানা এবং আহমেদাবাদ থেকে এই ছয় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার ভিত্তি: মধ্য মুম্বাইয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ভয় দেখিয়ে ৭০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ এই চক্রের সন্ধান পায়।
মূল অভিযুক্ত: এই চক্রের মূল হোতা হলো যুবরাজ, যার চীনের এবং কম্বোডিয়ার প্রতারকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। ওই বিদেশিরাই তাকে কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে এবং টাকা কীভাবে পাচার করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশ দিত।
অর্থ পাচার: অভিযুক্তরা প্রথমে প্রতারণার টাকা দুটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রাখত এবং তারপর সেই টাকা ১৩৮টি ভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করত। শেষমেশ সেই টাকা ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং আমেরিকান ডলারে পরিবর্তন করা হত।
ভুয়ো পরিচয়: অভিযুক্তরা সিবিআই (CBI), ইডি (ED), অ্যান্টি-টেরর স্কোয়াড (ATS), নিউ দিল্লি, এবং ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (NIA) সিনিয়র অফিসার সেজে প্রতারণা করত। তারা এনআইএ (NIA)-এর প্রধান এবং সিনিয়র আইপিএস অফিসার সদানন্দ ডেট সেজেও ভয় দেখাত।
জানা গিয়েছে, ৭২ বছরের ওই বৃদ্ধের কাছে গত ১৯ অগস্ট একটি ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে ইডি আধিকারিক হিসাবে পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, বৃদ্ধের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বেআইনি টাকা রয়েছে। এর পরেই তাঁকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করেন প্রতারকেরা। ওই বৃদ্ধ ও তাঁর স্ত্রীকে বলা হয়, তাঁদের অ্যাকাউন্টে থাকা সব টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে, যাতে যাচাই করা যায় টাকাটি বৈধ কি না। যাচাইয়ের পর টাকা তাঁদের অ্যাকাউন্টে ফেরত পাঠানো হবে বলেও আশ্বাস দেন প্রতারকেরা। এর পর ৪০ দিন ধরে অভিযোগকারী ও তাঁর স্ত্রীকে আলাদা আলাদা ব্যাঙ্কে গিয়ে দফায় দফায় ৫৮ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা নির্দিষ্ট কয়েকটি অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলা হয়। লেনদেনের গোটা সময়টা ফোন চালু রাখতে বলা হয় তাঁদের। প্রতারকদের কথা মতো টাকা পাঠিয়েও দেন তাঁরা।
দেশের সবচেয়ে বড় ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ জালিয়াতি
তদন্তে আরও জানা যায়, এই একই চক্রই ৭২ বছর বয়সী একজন ব্যবসায়ী-কে দুই মাস ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এ রেখে বিশাল অঙ্কের ৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতারকরা সিবিআই এবং ইডি-এর অফিসার সেজে ওই ব্যবসায়ী এবং তার স্ত্রীকে দুই মাস ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এ রেখেছিল। অক্টোবরের ৭ তারিখ হঠাৎ সন্দেহ হয় ওই দম্পতির। তড়িঘড়ি তাঁরা মহারাষ্ট্র সাইবার পুলিশের দ্বারস্থ হন। কিন্তু বিষয়টি জানতে পেরে পুলিস তদন্ত শুরু করতেই পরিকল্পনা বদলে ফেলেন প্রতারকেরা।
প্রাথমিক ভাবে মহারাষ্ট্র এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যের ১৮টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ওই অ্যাকাউন্টগুলির খোঁজ পাওয়া মাত্রই ৫৮ কোটি টাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৬,৫০০টি অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিসের দাবি, সাধারণ মানুষকে মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভ দেখিয়ে এই কাজে তাঁদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন প্রতারকেরা। এখনও পর্যন্ত এরকম সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতেরা সকলেই কমিশনের লোভে প্রতারকদের তাঁদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিস।
‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ আসলে কী?
‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ হলো এক ধরনের সাইবার অপরাধ, যেখানে প্রতারকরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বা সরকারি এজেন্সির কর্মকর্তা সেজে অডিও/ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখায়। তারা ভুক্তভোগীদের কার্যত জিম্মি করে এবং জোর করে টাকা দিতে চাপ সৃষ্টি করে।
অভিযুক্তদের পরিচয়
ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিস (জোন ৪), রাগাসুধা আর (Ragasudha R) জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তরা হলেন:
১. সুরেশকুমার মগনলাল প্যাটেল (৫১) ২. মুসরান ইকবালভাই কুম্ভার (৩০) ৩. চিরাগ মহেশ চৌধরী (২৯) ৪. অঙ্কিত কুমার মহেশভাই শাহ (৪০) ৫. বাসুদেব ওরফে ভিভান ওয়ালজিভাই বারোট (২৭) ৬. যুবরাজ ওরফে মার্কো ওরফে লক্ষ্মণ সিং সিকারওয়ার (৩৪)
ডিপিসি আরও জানান, যুবরাজই হলো এই চক্রের মূল হোতা, যে আন্তর্জাতিক অপরাধীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখত। সে গত তিন বছর ধরে এই ধরনের সাইবার জালিয়াতির সাথে জড়িত ছিল এবং প্রতারণার টাকার ওপর ৩% কমিশন পেত। যুবরাজ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ট্রেডারদের নিয়োগ করত যাদের নামে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা থাকত। সেই অ্যাকাউন্টগুলি জালিয়াতির টাকা রাখার জন্য ব্যবহার করা হত এবং এই অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদেরও ৩% কমিশন দেওয়া হত।
(Feed Source: zeenews.com)
