জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের জন্য কোন কোন নিয়ম মানা জরুরি এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব-সবটা নিয়েই সহজ ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি জানালেন ডিসান হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিনের অধিকর্তা ও ইন্টারনাল মেডিসিনের সিনিয়র কনসাল্ট্যান্ট ডা. অমিতাভ সাহা।

ICMR-INDIAB সমীক্ষা বলছে, ভারতে এখন ১০১ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবিটিসে ভুগছেন এবং ২০৪৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১৩৪ মিলিয়নে পৌঁছাবে। ডায়াবেটিস সারানো না গেলেও নিয়ম মেনে চললে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়-এটাই বিশেষজ্ঞের মত।
ডায়াবেটিস রোগীদের কোন কোন ভ্যাকসিন জরুরি?
ডায়াবেটিস রোগীর সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে নিউমোনিয়া (Pneumonia), ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza), হেপাটাইটিস-বি (Hepataitis B) এবং হারপেস জোস্টার (Herpes Zoster)। তাই আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী কিছু টিকা বাধ্যতামূলক।
- ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন – বছরে একবার। ৫০ বছরের বেশি হলে বিশেষভাবে দরকার তাহলে নিউমোনিয়া ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমায়।
- নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন – PCV20 একবার অথবা PCV13 নিয়ে এক বছর পর PPSV23।
- হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন – ১৯ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনে ৬০ বছরের বেশি বয়সেও দেওয়া যায়।
- হারপেস জোস্টার (Shingrix) – ৫০ বছরের বেশি ডায়াবেটিক রোগীর জন্য দুটি ডোজ। স্নায়ু-ব্যথাজনিত জোস্টারের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।
- কোভিড-১৯ বুস্টার – বয়স, শারীরিক অবস্থা ও সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী নিয়মিত বুস্টার।
কতদিন পর কোন কোন পরীক্ষা করা প্রয়োজন?
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করা বাড়ায় না; চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদ্যন্ত্র-সব জায়গায় নীরবে ক্ষতি করে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রতি ৩ মাসে: HbA1c (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন)
লক্ষ্য: সাধারণত < 7% (ব্যক্তিভেদে পরিবর্তনযোগ্য)। ফাস্টিং ও পোস্ট-প্র্যান্ডিয়াল গ্লুকোজ
- প্রতি ৬ থেকে ১২ মাসে: কিডনি ফাংশন (সিরাম ক্রিয়েটিনিন, eGFR, UACR)
লিপিড প্রোফাইল – লক্ষ্য সাধারণত < 70 mg/dL উচ্চ-ঝুঁকির রোগীদের জন্য
লিভার ফাংশন – NAFLD (Metabolic Syndrome) এবং প্রয়োজন হলে TSH (টাইপ ১ ডায়াবেটিসে বা উপসর্গ থাকলে)।
- প্রতি বছর: রেটিনা পরীক্ষা (Dilated Fundoscopy); পায়ের স্নায়ু পরীক্ষা (Monofilament/ Vibration test); ECG ও কার্ডিয়াক রিস্ক মূল্যায়ন; ডেন্টাল চেক-আপ।
প্রয়োজনে CGM (Continuous Glucose Monitoring), স্ট্রেস টেস্ট, এবং Vitamin D ও B12 পরীক্ষা।
পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ (PAD) প্রতিরোধে কী করণীয়?
ডায়াবেটিস PAD-এর বড় ঝুঁকিপ্রবণ অবস্থা। এতে পায়ে রক্তপ্রবাহ কমে ব্যথা, ক্লডিকেশন, এমনকি গ্যাংগ্রিনের ঝুঁকি বাড়ে।
- রক্তে শর্করা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ
HbA1c 6.5-7% রেঞ্জে রাখলে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ-উভয় রক্তনালী সুরক্ষিত থাকে।
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
লক্ষ্য থাকবে <130/80 mmHg. ACE inhibitor/ARB সাধারণত উপকারী।
- লিপিড নিয়ন্ত্রণ
LDL < 70 mg/dL হল স্বর্ণমানদণ্ড। Statin therapy PAD প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
- ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন
ধূমপান PAD-এর সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ঝুঁকি। এটি আর্টারির ক্যালিবার কমায়, থ্রম্বোসিস বাড়ায়।
- প্রতিদিন হাঁটা এবং নিয়মিত ফুট কেয়ার
৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা রক্তনালীর কোলেটারাল সার্কুলেশন বাড়ায়। পায়ে কাটা/ফোস্কা/গরম-ঠান্ডা অনুভূতি কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল উচ্চ-ঝুঁকির রোগীর ক্ষেত্রে উপকারী।
- প্রয়োজন হলে ABI ও ডপলার স্টাডি
প্রয়োজনে ভাসকুলার বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন করান।
সেমাগ্লুটাইড কি সকল ডায়াবেটিক রোগীর জন্য?
সেমাগ্লুটাইড ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। তবে এটি সবার জন্য নয়।
যাদের জন্য উপযোগী:
1. টাইপ-১ ডায়াবেটিস
2. গর্ভবতী/স্তন্যদানরত নারী
3. থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস
4. প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস
5. গুরুতর পেটের অসুখ
যাদের জন্য নয়:
1. টাইপ-১ ডায়াবেটিস
2. গর্ভবতী/স্তন্যদানরত নারী
3. থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস
4. প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস
5. গুরুতর পেটের অসুখ
ওষুধ ব্যবহারের বিশেষ দিক:
ড্রাগ শুরু করার সময় ধীরে ডোজ বাড়াতে হয় এবং বমি–বমি ভাব বা পেটে অস্বস্তি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
অবশেষে, ডা. সাহার মতে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু সুগার কমানো নয়-নিয়মিত ভ্যাকসিন, অঙ্গ-প্রতঙ্গের সুরক্ষা, রক্তনালীর যত্ন এবং রোগী-ভেদে উপযুক্ত ওষুধ-এই চারটি স্তম্ভই একজন ডায়াবেটিস রোগীর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। জীবনযাপনে সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চিকিৎসাই ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
(Feed Source: zeenews.com)
