
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পুনর্মিলনের কোনও সম্ভাবনা না থাকলে আলাদা হয়ে থাকা দম্পতিকে ‘মৃত বিবাহে’ (Dead Marriage) জোর করে আটকে রাখা যায় না – পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court)। যে বিবাহে ভাঙন অপরিহার্য অর্থাত্ কোনভাবেই জোড়া লাগবে না, (irretrievable breakdown) সেই বিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা কার্যত দম্পতিদের জন্য ‘নিষ্ঠুরতা’ (cruelty) বলে গণ্য হবে। যখন পুনর্মিলনের কোনও আশা নেই, তখন স্বামী-স্ত্রীর ‘মৃত বিবাহে’ (dead marriage) থাকতেও বাধ্য করা উচিত নয়।
বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের বেঞ্চ একজন স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল পারিবারিক আদালত। এরপর এই আদেশের বিরুদ্ধে করা একটি চ্যালেঞ্জের শুনানিতে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে, ‘একটি হিন্দু বিবাহ মূলত যে পবিত্র ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে তাতে আদালত এই রায় দিচ্ছে যে পুনর্মিলনের কোনও সম্ভাবনা না থাকলে স্বামী-স্ত্রীকে নামমাত্র বিয়ে অর্থাত্ মৃত বিয়েতে আটকে রাখা উচিত নয়।’
বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে জানায় যে, বিবাহ পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে, তা দুই পক্ষকেই কষ্ট দেয়, অস্বস্তি দেয়। অকারণ টেনে নিয়ে গেলে তা বোঝা বাড়ায়। জন্ম দেয়, শুধুই তিক্ততা আর ক্লান্তি। কারণ এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে থাকা দুই পক্ষকেই না চাইতেও কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
পারিবারিক আদালত বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর স্বামী ২০২২ সালের সেই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আসেন।
আবেদনকারী অভিযোগ করেন যে, তাঁর স্ত্রী তার নিয়মিত কাজ ছাড়াও বাবার বাড়িতে প্রাইভেট টিউশন পড়াতেন এবং গভীর রাতে শ্বশুরবাড়িতে ফিরতেন।
স্বামীর পক্ষে আইনজীবী রাজদীপ ভট্টাচার্য যুক্তি দেন যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহের সুতো কেটে গিয়েছে। আশ্চর্যজনক ভাবে স্ত্রী, স্বামীর আপিলের বিরোধিতা করতে কখনই আদালতে উপস্থিত হননি এবং হাইকোর্ট কর্তৃক বিষয়টি মধ্যস্থতার (mediation) জন্য পাঠানো হলেও তিনি সেই প্রক্রিয়া থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি আরও জানান যে, গত এক দশক ধরে স্ত্রী, স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় শুরু করার কোনও প্রচেষ্টা করেন নি।
প্রধান পর্যবেক্ষণগুলি
এই প্রসঙ্গে ভারতে বৈবাহিক আইনের বিবর্তনকে উপেক্ষা করা যায় না। যদিও হিন্দু বিবাহ আইন (HMA)-এর মতো ব্যক্তিগত আইনে পূর্বে হিন্দু বিবাহকে একটি সংস্কার বা পবিত্র বন্ধন (sacrament) বলে মনে করা হতো, সময় পরিবর্তিত হয়েছে, এবং ধীরে ধীরে এতে একটি চুক্তির উপাদান (contractual ingredient) যুক্ত হয়েছে।
১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন প্রণয়নের সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদালতের হস্তক্ষেপের পরিধি প্রসারিত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট তার আগের রায়গুলিতে শুধুমাত্র অপূরণীয় ভাঙ্গনের ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদ মঞ্জুর করার জন্য সংবিধানের আর্টিকেল ১৪২ (সুপ্রিম কোর্টের ডিক্রি ও আদেশের কার্যকরীকরণ এবং অনুসন্ধানের বিষয়ে আদেশ) এর অধীনে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সওয়াল-জবাব শোনার পর বেঞ্চ রায় দেয় যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ‘মেরামতের অযোগ্য’।
আদালত বলে, ‘স্ত্রীর দেরিতে বাড়ি ফেরা নিয়ে সম্মানিত বিচারক (ট্রায়াল জাজ)-এর এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত যে স্ত্রীর এই ধরনের আচরণকে স্বতঃসিদ্ধভাবে (ipso facto) নিষ্ঠুরতা হিসাবে গণ্য করা যায় না।’
আদালতের আদেশে আরও উল্লেখ করা হয় যে ২০১৫ সালে মামলা দায়ের করার পর থেকে চলে আসা গত এক দশকে বর্তমান ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে ‘অ্যানিমাস রিভার্টান্ডি’ (animus revertandi) অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্ক পুনরায় শুরু করার ইচ্ছার উপাদান সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত ছিল।
(Feed Source: zeenews.com)
