Bangladesh Violence: ১২৫ কোটি টাকার সুপারি, হাদির মাথার বাঁপাশে শ্যুটারের লক্ষ্যভেদ! গাঢ় চক্রান্তের বড় নেটওয়র্ক, সরব তসলিমাও…

Bangladesh Violence: ১২৫ কোটি টাকার সুপারি, হাদির মাথার বাঁপাশে শ্যুটারের লক্ষ্যভেদ! গাঢ় চক্রান্তের বড় নেটওয়র্ক, সরব তসলিমাও…

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশে অস্থিরতার নেপথ্যে কি গভীর ষড়যন্ত্র? শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ও দীপু দাসের গণপিটুনিতে হত্যা নিয়ে উত্তাল বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মহলে এই ধটনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। উঠে আসছে ১২৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য। হাদিকে মারার জন্য হত্যাকারীদের ব্যাংকে বিশাল সংখ্যক টাকা এসেছিল।

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া একের পর এক হিংসার ঘটনা দেশকে এক অস্থির পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে উগ্রবাদী নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড এবং অন্যদিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস গণপিটুনি—এই দুটি ঘটনার যোগসূত্র এবং এর নেপথ্যে থাকা বিশাল অর্থের লেনদেন এখন গোয়েন্দাদের নজরে। বিশেষ করে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য, যা এই বিশৃঙ্খলার পেছনে কোনও শক্তিশালী নেটওয়ার্কের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: যেখান থেকে উত্তাপের শুরু

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ ডিসেম্বর। রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় ভরদুপুরে মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

গত শনিবার (২০ ডিসেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার নামাজের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

হাদির হত্যাকারী

অভিযোগ, হাদির হত্যাকারী ফয়সাল ও আলমগীর উভয়েই দেশের আগের শাসকদল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে চলে এসেছেন কি না, তা নিয়ে এখনও ধন্দে বাংলাদেশের পুলিস। বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিসের প্রধান মহম্মদ শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে। অভিযুক্তেরা ভারতে পালিয়ে এসেছেন কি না, সে বিষয়ে পুলিস এখনও নিশ্চিত নয়। অভিবাসন সংক্রান্ত নথিতে ফয়সাল বা আলমগীরের দেশ ছা়ড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবৈধ ভাবে সীমানা পেরিয়ে তাঁরা অন্য দেশে চলে গিয়েছেন কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ-হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছেন ফয়সালেরা। এ বিষয়ে ফয়সালের স্ত্রী, মা-বাবা এবং বান্ধবীকে জেরা করা হচ্ছে। দুই অভিযুক্তের পাসপোর্টও ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

সিআইডির বিস্ফোরক তথ্য: ২১৮ কোটি টাকার চেক ও মানিলন্ডারিং

হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে পুলিসের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর আর্থিক অসঙ্গতি খুঁজে পেয়েছে। সিআইডির মতে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো সাধারণ অপরাধী চক্র নয়, বরং একটি সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। সিআইডি জানায়, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ওসমান হাদি মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেই সিআইডি এ ঘটনার নানাদিক নিয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলে দ্রুততম সময়ে ক্রাইমসিন ইউনিটের উপস্থিতি, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থল থেকে ঘাতকের ব্যবহৃত গুলির খোসা উদ্ধার ও পরবর্তীতে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক পরীক্ষাসহ এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নানাদিক নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে সিআইডি। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত ব্যাংক হিসাবের তথ্য নিয়ে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে সিআইডি।

বিশাল অংকের চেক: সিআইডি জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বেশ কিছু চেক বই উদ্ধার করা হয়েছে। এসব চেকে বিভিন্ন অংকের টাকার উল্লেখ রয়েছে, যার সমষ্টিগত মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা। যদিও এই লেনদেনগুলো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও এত বিশাল অংকের রেকর্ড গোয়েন্দাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

অস্বাভাবিক লেনদেন: সিআইডির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকারও বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ মানিলন্ডারিং, সংঘবদ্ধ অপরাধ বা সন্ত্রাসী অর্থায়নের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া: বর্তমানে অভিযুক্তদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই অর্থের মূল যোগানদাতা কারা, তা চিহ্নিত করতে সিআইডির একাধিক টিম কাজ করছে।

তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য

নিজের সোশ্য়াল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন লিখেছেন-  ‘কয়েক ঘণ্টা ধরে জিহাদিরা ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ছায়ানট, আর উদীচীর কার্যালয় লুঠ করেছে, ভেঙেছে,  পুড়িয়েছে। পুলিশ আসেনি। মনে হচ্ছে  গোটা ব্যাপারটাই করিয়েছে সরকার। পুলিশ সরকারের গ্রিন সিগ্নেল পায়নি বলে কর্মস্থল ত্যাগ করেনি।
দীপু কাণ্ডেও  ভিকটিমের মৃত্যু হয়ে যাওয়ার পরে ঘটনাস্থলে পুলিস এসেছে। সময় মতো পুলিসকে আসতে বাধা দেয় কারা? হয়তো তারাই, যারা পুলিসকে নির্দেশ দেয়, এবং বলে দেয় নির্দেশ ছাড়া কোথাও, বিশেষ করে সেনসিটিভ কেসে, আচমকা উদয় না হতে!
হাদির সম্ভাব্য আততায়ী ফয়সলের  একাউন্টে  ১২৫ কোটি টাকার লেনদেন পাওয়া  গিয়েছে। টাকাটা কে দিল? সরকারের অদৃশ্য হাত নয় তো?’

ভালুকায় দীপু দাসের নৃশংস মৃত্যু: একটি ‘পরিকল্পিত’ হত্যাকাণ্ড?

হাদি হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় এক নারকীয় ঘটনা ঘটে। ধর্ম অবমাননার অস্পষ্ট অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তবে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এটি কেবল তাৎক্ষণিক কোনও ক্ষোভ ছিল না।

কারখানার ভূমিকা: র‍্যাব ও পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, কারখানার সুপারভাইজাররা দীপুকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দেন। পুলিশ জানিয়েছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ অনেক দেরিতে খবর দিয়েছে। এসপি ফরহাদ হোসেনের ভাষায়, “ঠিক সময়ে একটি ফোন করলে হয়তো দীপু বেঁচে যেত।”

গুজব ও গণপিটুনি: কোনও প্রমাণ ছাড়াই অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সহকর্মীরা ও স্থানীয় জনতা দীপুকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তার মৃতদেহ ঝুলিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

গ্রেফতার: সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে কারখানার ফ্লোর ইন-চার্জ ও কোয়ালিটি ইন-চার্জও রয়েছেন।

স্বজনদের আর্তনাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

দীপুর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবারে। তিন বছরের বিবাহিত জীবনে দীপুর একটি দেড় বছরের সন্তান রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীপুর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে আছি, এই পাপের বিচার হবেই।’

অন্যদিকে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টিকে একটি “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” হিসেবে দেখলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে।

তদন্তের গতিপথ: ষড়যন্ত্র কোথায়?

সিআইডি বর্তমানে খতিয়ে দেখছে যে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করার জন্য যে নেটওয়ার্ক অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, সেই একই নেটওয়ার্ক কি দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে দীপু দাসের হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় উস্কানি দিয়েছে?

তদন্তকারী কর্তাদের মতে, ২১৮ কোটি টাকার রেকর্ড এবং ১২৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন নির্দেশ করে যে, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে একটি বড় ধরনের অর্থায়ন সক্রিয় রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরিকল্পনা, অস্ত্র সরবরাহ এবং এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক উন্মোচন করাই এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ।

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু এবং দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড—উভয় ঘটনাই বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উস্কানি; এই দুটির মাঝে বিশাল অংকের অর্থের প্রবাহ প্রমাণ করে যে নেপথ্যে কোনও অশুভ শক্তি সক্রিয়। সত্য উন্মোচন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তিই পারে দেশের মানুষের মনে আবার স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।

(Feed Source: zeenews.com)