Bangladesh Unrest | Tarique Rahaman Returns in Bangladesh: হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলা, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগে হাজতবাস! ১৭ বছর পর দেশে ফেরা তারেকের বর্ণময় চাঞ্চল্যকর জীবন…

Bangladesh Unrest | Tarique Rahaman Returns in Bangladesh: হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলা, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগে হাজতবাস! ১৭ বছর পর দেশে ফেরা তারেকের বর্ণময় চাঞ্চল্যকর জীবন…

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশের (Bangladesh Politics) রাজনৈতিক ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেমন একটি অবিস্মরণীয় দিন, তেমনি ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর যুক্ত হল (2025, 25th December) আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বড়দিনের সকালে ঢাকার মাটি ছুঁল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার (Begam Khaleda Zia) দল বিএনপি’র (Bangladesh Political Party BNP) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tareq Rahaman)। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল দেশের ছেলের ঘরে ফেরা নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত।

বাংলাদেশের অস্থির অবস্থা: 

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে ঘটে (Bangladesh violence) যাওয়া একের পর এক হিংসার ঘটনা দেশকে এক অস্থির পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে উগ্রবাদী নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড (Osman Hadi Murder) এবং অন্যদিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসের (Dipu Das Murder in Bangladesh) নৃশংস গণপিটুনি—এই দুটি ঘটনার যোগসূত্র এবং এর নেপথ্যে থাকা বিশাল অর্থের লেনদেন এখন গোয়েন্দাদের নজরে। বিশেষ করে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য, যা এই বিশৃঙ্খলার পেছনে কোনও শক্তিশালী নেটওয়ার্কের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ ডিসেম্বর। রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় ভরদুপুরে মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

দীপু দাস হত্যাকাণ্ড

হাদি হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় এক নারকীয় ঘটনা ঘটে। ধর্ম অবমাননার অস্পষ্ট অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তবে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এটি কেবল তাৎক্ষণিক কোনও ক্ষোভ ছিল না।

র‍্যাব ও পুলিসের তদন্তে দেখা গেছে, কারখানার সুপারভাইজাররা দীপুকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দেন। পুলিস জানিয়েছে, কারখানা কর্তৃপক্ষ অনেক দেরিতে খবর দিয়েছে। এসপি ফরহাদ হোসেনের ভাষায়, ‘ঠিক সময়ে একটি ফোন করলে হয়তো দীপু বেঁচে যেত।’

আর এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশ আর সেই সঙ্গে ফেব্রুয়ারীতে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেকের দেশে ফেরা এক গভার রাজনৈতিক বার্তা বহন করে বলেই রাজনৈতিক মহলের মত।

সংবর্ধনা ও রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

আজ বড়দিনের সকালে লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে তারেক রহমানের বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরের রেড জোনে তাঁকে স্বাগত জানান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনা সমাবেশে যোগ দেন তিনি। ‘মা-মাটি ডাকছে, তারেক রহমান আসছে’—এমন স্লোগানে মুখরিত কুড়িল বিশ্বরোড থেকে সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর ঢল নামে।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য শেষে তিনি সরাসরি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন, যেখানে তাঁর মা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর মা ও ছেলের এই সাক্ষাৎ হবে, যা রাজনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে এক আবেগঘন মুহূর্তই বটে।

‘প্লাস ওয়ান’ ও ‘মাইনাস ফোর’ ফর্মুলার অবসান

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানের এই ফিরে আসাকে দেখছেন ‘প্লাস ওয়ান’ হিসেবে। ২০০৬-০৭ সাল থেকে আলোচিত ‘মাইনাস টু’ বা পরবর্তী সময়ে ‘মাইনাস ফোর’ ফর্মুলা (যেখানে হাসিনা, খালেদা এবং তাঁদের পুত্রদের রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল) কার্যত ভেস্তে গেল।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি: শেখ হাসিনা দেশত্যাগী এবং দলের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে থাকায় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।

বিএনপি’র পুনর্জাগরণ: খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে না পারলেও, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন নির্বাচনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

আইনি লড়াই ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

তারেক রহমানের দেশে ফেরার পথ সুগম হয়েছে সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে। ৫ আগস্টের পর উচ্চ আদালত তাঁকে দুর্নীতি ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলা-সহ সমস্ত মামলা থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। তবে দেশে ফিরলেও তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে বিএনপি গভীর চিন্তিত।

‘তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিস, র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী (সিএসএফ) দিয়েও নিবিড় সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।’- বিএনপি তাদের মুখপত্রে জানান।

নির্বাসনের পেছনের কথা

২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ আনা হয়েছিল। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির চিঠিতে তাঁকে ‘ভয়ঙ্কর দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সেই নেতিবাচক ইমেজ কাটিয়ে জননেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন তারেকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিএনপি’র পালে হাওয়া: 

বিএনপি’র জন্য চলতি পরিস্থিতি যে গুরুতর রাজনৈতিক সংকট তাতে কোন সন্দেহ নেই। ‌আওয়ামী লিগের সঙ্গে তাদের ফারাক হল, শেখ হাসিনার দলের সরকারিভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং দলনেত্রী সহ পার্টির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দেশ ছাড়া অথবা আত্মগোপনে আছেন। অন্যদিকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা গুরুতর অসুস্থ। ‌কার্যনির্বাহী চেয়ারপারসন তারেক‌ অদৃশ্য শক্তির অনুমতি না পাওয়ায় এতদিন দেশে ফিরতে পারছিলেন না। এবার নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি’র বিরুদ্ধে অন্যতম ইস্যু হতে চলেছে কেন ১৭ বছর আগে তারেক জিয়াকে দেশ ছেড়ে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

তিনি ২০০৮ সাল থেকে লন্ডন নিবাসী।  চিকিৎসা করাতে গিয়ে‌ আর দেশে ফেরেননি।‌ তাঁর লন্ডন যাত্রার কাহিনি অবশ্য ভিন্ন।‌

এতদিন কেন দেশছাড়া তারেক রহমান?

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিএনপি বারে বারে অভিযোগ করত, আওয়ামী লিগ সরকারের প্রতিহিংসার ভয়ে তারেক দেশে ফিরতে পারছেন না। তখন দুর্নীতির একাধিক মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। এমনকী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল।‌

সেই পরিস্থিতির আচমকা আমূল পরিবর্তন ঘটে যায় গত বছর ৫ অগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর।‌ বাংলাদেশের উচ্চ আদালত গুলি তারেক জিয়াকে সমস্ত মামলা থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। ফলে আইনত তাঁর দেশে ফিরতে কোন বাধা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারও জানিয়েছিল, বিএনপি’র কার্যনির্বাহী চেয়ারপারসন তারেক জিয়ার দেশে ফেরা নিয়ে তাঁদের কোন আপত্তি নেই। মামলা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ায় তারেক জিয়ার গত মাসেই দেশে ফেরার কথা ছিল। বিএনপি ইতিমধ্যে তাঁকে আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দল ক্ষমতা এলে তারেক প্রধানমন্ত্রী হবেন এমন ঘোষণাও বিএনপির তরফে করা হয়েছে।

ফিরে দেখা ১৭ বছর আগের সেই কালিমালিপ্ত ইতিহাস

তারেকের এতদিন এতদিন দেশে ফিরতে না পারা নিয়ে আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে ১৭ বছর আগে ২০০৮-এ তাঁর দেশত্যাগের প্রসঙ্গ। সেই সময় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করেছিল দুর্নীতির একাধিক অভিযোগে। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ‌প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। অভিযোগ, মায়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের‌ সুযোগ নিয়ে তারেক ঢাকার হাওয়া ভবনে সমান্তরাল প্রশাসন খুলে বসেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ এনেছিল। গ্রেফতার করে তারেককে সেনা হেফাজতে রাখা হয়। সেখানে তাঁর ওপর গুরুতর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করা হয়েছিল বলে দেশ ছাড়ার পর অভিযোগ করেছিলেন তারেক। ‌

বিএনপি রাজনৈতিক ইতিহাসে সে এক অন্ধকারময় পর্ব। খালেদা জিয়া সপরিবারে অর্থাৎ তিনি নিজে এবং তাঁর দুই পুত্র তারেক ও আরাফাত রহমান ওরফে কোকো একই সময়ে দুর্নীতির মামলায় জেলে ছিলেন। ‌ খালেদা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অনুনয় বিনয় করে প্রথমে তাঁর ছোট ছেলে কোকোর জামিনের ব্যবস্থা করেন। ‌জামিনে মুক্ত কোকো প্রথমে থাইল্যান্ড, পরে মালয়েশিয়ায় থিতু হন। মালয়েশিয়াতেই অকালে মারা যান খালেদার ছোট ছেলে।

বাংলাদেশের ২০০৮-এর নির্বাচন

জেলবন্দি খালেদা ২০০৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিলে সেনাবাহিনী তাঁর ওপর প্রবল চাপ তৈরি করে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার শর্তে খালেদার দাবি মতো বড় ছেলে তারেককেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যান।

তার আগে সেনাবাহিনীকে খালেদা কথা দেন তারেক আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। সেই সময় তারেক ছিলেন বিএনপি সিনিয়র মহাসচিব। ‌জামিন পাওয়ার অলিখিত শর্ত হিসেবে তিনি দলীয় পথ থেকে ইস্তফা দেন।

সে সময় কারাগারে ছিলেন বিএনপি’র প্রবীণ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা মওদুদ আহমদ। তাঁর আত্মজীবনী মূলক বই‌ ‘কারাগারে কেমন ছিলাম, ২০০৭-২০০৮’-এ দীর্ঘদিন খালেদা জিয়ার আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা এই ব্যারিস্টার লিখেছেন, সেই সময় সেনা কর্তাদের সঙ্গে জেলখানায় প্রায়ই বৈঠক হতো খালেদা জিয়ার। প্রবীর নেতার ধারণা তারেক জিয়া আর রাজনীতিতে আসবেন না, এই মর্মে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তখন মুচলেকা দিয়ে থাকতে পারেন।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ

তবে তারেক রহমান জিয়ার জন্য আরও বড় বিপদের কারণ হয় বাংলাদেশের তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির হোয়াইট হাউসে পাঠানো গোপন তারবার্তা। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া সেই বার্তায় দেখা যায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত তারেক জিয়াকে এক ভয়ঙকর দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন এই ব্যক্তিকে‌ ঘুষ না দিয়ে বাংলাদেশে কোনও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এরফলে মার্কিন স্বার্থ বিপন্ন হচ্ছে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই ছোট দেশটি ক্রমশ দুর্নীতি চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে বলে মার্কিন কূটনীতিক তাঁর কেবলে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে হোয়াইট হাউজকে পরামর্শ দেন তারেক জিয়াকে যেন কখনও আমেরিকায় যাওয়ার ভিসা না দেওয়া হয়। সেই থেকে তারেকের আমেরিকা যাওয়া বন্ধ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের খবর, ২০০৮-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারেককে জামিন দিলেও তাতে আপত্তি ছিল সেনাবাহিনীর।

সেনার তৎকালীন প্রধান মঈন‌ ইউ আহমদ চেয়েছিলেন তারেককে কারাগারে বন্দী রেখে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে। কিন্তু খালেদা জিয়ার পীড়াপীড়িতে তাঁর বড় পুত্রকেও শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয়। চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলেও তারেক দীর্ঘ ১৭ বছর দেশে ফেরেননি।‌ নির্বাচনের জীবন শেষ করে বৃহস্পতিবার স্বদেশে ফিরছেন তারেক। ‌ তবে বিএনপির অন্দরমহল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিবিরের খবর দেশে ফিরলেও তারেক জিয়া কতটা স্বাধীনভাবে মুক্ত পরিবেশে রাজনীতি করতে পারবেন তা নিয়ে ঘর সংশয় আছে। ‌

সেনাবাহিনীর একটি প্রভাবশালী অংশ তার প্রত্যাবর্তনের ঘোরতর বিরোধিতা করেছে। দেশে থাকার সময় তারেক মায়ের প্রধানমন্ত্রীতে সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি এমনকি সেনা-পুলিসের প্রভাব খাটাতে গিয়ে যে অনাচার করেছেন বলে অভিযোগ, সেটাও তার দিকে ব্যাক ফায়ার করতে পারে এমন আশঙ্কাও করছে বিএনপি।‌ এক কথায় তারেকের শত্রু চারধারে আছে। নিরাপত্তার শঙ্কা নিয়েই দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। নিরাপত্তা এবং মৃত্যুভয় সঙ্গী করেই তাঁকে রাজনীতি করতে হবে। তার জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হবে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না পারা বা তিনি কোন কারণে প্রধান মুখমন্ত্রী না হতে পারলে। কারণ লন্ডনের ফের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

২০০৭ (৭ মার্চ): তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার হন। এরপর প্রায় ১৮ মাস তিনি কারাবন্দী ছিলেন।

২০০৮ (৩ সেপ্টেম্বর): সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন লাভ করেন। কারাগারে থাকাকালীন তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

২০০৮ (১১ সেপ্টেম্বর): উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সপরিবারে লন্ডনের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। সেই সময় তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

২০০৯ (ডিসেম্বর): প্রবাসে থাকাকালীনই বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

২০১১ (নভেম্বর): মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির ফাঁস হওয়া তারবার্তায় (উইকিলিকস) তারেক রহমানকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর নেতিবাচক তথ্য সামনে আসে, যা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

২০১৬ (জুলাই): মুদ্রা পাচার মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে হাইকোর্ট তাঁকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ কোটি টাকা জরিমানা করে।

২০১৮ (৮ ফেব্রুয়ারি): জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ার পর তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০১৮ (১০ অক্টোবর): ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।

২০২৩ (আগস্ট): অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় তাঁকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপি এসব রায়কে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

২০২৪ (৫ আগস্ট): ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে।

২০২৪ (নভেম্বর-ডিসেম্বর): বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একে একে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত সাজা ও মামলা বাতিল বা নিষ্কৃতি দেয়। আইনি বাধা দূর হওয়ায় তাঁর দেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়।

২০২৫ (২৫ ডিসেম্বর): দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বীরের বেশে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান নেতা হিসেবে রাজনীতিতে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক।

আগামী দিনের কর্মসূচি

তারেক রহমানের আগামী তিন দিনের ঠাসা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। ২৬ ডিসেম্বর- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত ও জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন। ২৭ ডিসেম্বর- জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার নিবন্ধন সম্পন্নকরণ।  ২৭ ডিসেম্বর- জুলাই আন্দোলনে নিহত শরিফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত ও পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শন। |

কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সমীকরণ

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল দেশীয় রাজনীতি নয়, বরং ভারত ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে ‘জামায়াতে ইসলামী’র মতো কট্টরপন্থী দলের উত্থান রুখতে ভারতের কূটনৈতিক মহলের একাংশ তারেক রহমানের ওপর ভরসা দেখছে। তবে দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর একটি অংশের বিরোধিতা এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি তাঁর আগামী দিনের পথচলাকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন গতির সঞ্চার করেছে তা বলাই বাহুল্য, তবে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ব্যালট বক্সে এই প্রত্যাবর্তনের উচ্ছ্বাস কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

(Feed Source: zeenews.com)