)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে এক বর্ণাঢ্য ও আবেগঘন পরিবেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন (Tarique Rahman returns in Bangladesh) করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত (BNP Chairperson) চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ব্রিটেন থেকে স্ত্রী ও কন্যাসহ তিনি ঢাকা পৌঁছান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার পূর্বাচলে ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে’ আয়োজিত এক বিশাল গণসংবর্ধনা সমাবেশে তিনি আগামী দিনের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। রাজকীয় সম্বর্ধনায় দেশে ফিরলেন রাজপুত্র, তবে, পদ্মাপারের রাজত্ব কি তাঁর? যে দোষে, দুর্নীতিতে তিনি জেল খেটেছেন, খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় সমান্তরাল সরকারি কাজকর্ম চালাত, লক্ষ-কোটি টাকা তুলত জনসাধারণের কাছ থেকে প্রতিটি কাজের জন্য এবং আকন্ঠ অসত্য ও মিথ্যাচারের দায়ে তাঁকে দেশ ছেড়ে লন্ডনে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, ১৭ বছর পর ফিরে চাঁচাছোলা ভাষণে কি তারই প্রায়শ্চিত্ত করলেন তারেক জিয়া? বিএনপি এবং জামাতের যোগ বহু পুরনো। তাই কি সন্তর্পণে বাংলাদেশের জামাত সম্প্রদায়কে খুশি করে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসতে তার এই আগুনে বক্তৃতা?
রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
বুধবার সন্ধ্যায় লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইটে যাত্রা শুরু করে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারেক রহমান। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের যে ঢল নেমেছিল, তা সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে বিরল। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে তাঁকে বহনকারী বাসের সময় লেগেছে প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি। পুরো পথ ছিল লোকে লোকারণ্য।
তসলিমার তীর তারেকের দিকে
সারা পৃথিবীর সব সংবাদমাধ্যম মোটামুটি তারেকের এই বক্তব্য তাদের প্রথম পাতায় রেখেছে। আর তাঁর এই বক্তব্যের পরই বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin FB post) সোচ্চার হয়েছেন তারেকের দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে। তাঁর সমাজ মাধ্যমের পাতায় তসলিমা তারেকের উদ্দেশ্য প্রশ্ন রাখেন যে, এতদিন লন্ডনের মতো একটি প্রথম বিশ্বের দেশে থেকে কি ভদ্র-সভ্য হয়েছেন? একসময় বাংলাদেশের হাওয়া ভবনে বসে প্রচুর তোলাবাজি করতেন তারেক- নিজের পোস্টে তিনি এমনও দাবি করেন।
‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ থেকে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’
বিকেলে পূর্বাচলের ৩০০ ফুটের সেই বিশাল গণসংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণের প্রধান উপজীব্য ছিল আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সেই বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বক্তৃতার আদলে নিজের রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরা। তারেক রহমান বলেন, ‘লুথার কিং বলেছিলেন তাঁর একটি স্বপ্নের কথা, কিন্তু আমি বলতে চাই—আমার একটি পরিকল্পনা আছে (I have a plan)। এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, দেশের স্বার্থের জন্য।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ব্যক্তিগত স্বপ্নের চেয়ে সামষ্টিক পরিকল্পনা বেশি কার্যকর। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ পরিবর্তন করে ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান’ (আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে) বলে সকলকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বার্তা দেন।
শহীদদের রক্তের ঋণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ
ভাষণে তারেক রহমান সদ্য সমাপ্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ শফিক ওসমান হাদির কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদি চেয়েছিলেন এই দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে আসুক। তাঁর মতো অসংখ্য শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে আমাদের এমন এক বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না।’
তসলিমার বক্তব্য
আর এখানেই তীব্র রাগ প্রকাশ করেন তসলিমা। কেন শুধু ওসমান হাদি? কেন হিন্দু যুবক দীপু দাসের মৃত্যু নিয়ে একবর্ণ বাক্য খরচ করেননি তারেক? সবই কি মুসলমানদের তোষণ করার চাল? তসলিমা এমনও বলেন যে, তাহলে কী ভাবে তারেক জিয়া তাঁর ভাষণে বললেন যে, সব ধর্ম, সব জাতি, সব বর্ণ, সব সম্প্রদায়ের মানুষের সুরক্ষা দেবে নতুন বাংলাদেশ? হিন্দুদের সুরক্ষা কে দেবে এই অশান্ত বাংলাদেশে?
তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন তুলে ধরে বলেন, এই বাংলাদেশ হবে সমতল ও পাহাড়ের মানুষের, মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার। তিনি এমন এক ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেন, যেখানে একজন শিশু বা নারী ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদভাবে আবার ঘরে ফিরে আসতে পারবে।
রাজনৈতিক কৌশল ও ভূ-রাজনীতি
তারেক রহমানের ভাষণে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিল দিকগুলোও ফুটে উঠেছে। বিগত ১৫ বছরের শাসনের কঠোর সমালোচনা করলেও তিনি সরাসরি কারও নাম নেননি। তবে ‘আধিপত্যবাদী শক্তির’ বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘আধিপত্যবাদ’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি যেমন ভারতের প্রতি কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেমনি কৌশলগত কারণে নয়া দিল্লির সাথে তাঁর সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ভারতবিরোধী তকমা যেন তাঁকে একতরফাভাবে আঁকড়ে না ধরে, সেজন্যই তিনি সতর্কভাবে ‘আধিপত্যবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
শান্তি ও শৃঙ্খলার আহ্বান
দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তারেক রহমান তাঁর কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে অত্যন্ত ধৈর্যশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “যেকোনো উসকানির মুখে শান্ত থাকতে হবে। বিশৃঙ্খলা পরিহার করে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।” এছাড়া তিনি আগামী দিনে দেশ পরিচালনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দেন।
ব্যক্তিগত আবেগ ও দলীয় সংহতি
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তারেক রহমান তাঁর অসুস্থ মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কথা উল্লেখ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “সন্তান হিসেবে আমার মন হাসপাতালে মায়ের শয্যার পাশে পড়ে আছে, কিন্তু দেশের মানুষকে আমি ফেলে যেতে পারি না।”
মঞ্চে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সকল জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়ে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির বার্তা দেন।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। তাঁর ১৬ মিনিটের সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ ভাষণটি ছিল আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রাথমিক রূপরেখা। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা এই নেতা তাঁর সেই ‘পরিকল্পনা’ দেশের আপামর জনসাধারণের সহযোগিতায় কীভাবে বাস্তবায়ন করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি এবার কোন দিকে ঘোরে, তা হয়ত, সময়ই বলবে।
(Feed Source: zeenews.com)
