
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশে ইনকিলাব মঞ্চের (Inquilab Manch) নেতা ওসমান হাদি (Osman Hadi murder case) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারতীয় উপমহাদেশের সমীকরণ বদলেছে। ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ (India-Bangladesh internal relation) সম্পর্কে চিড় ধরেছে। প্রাক্তন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার (Begum Khaleda Zia death Case) অন্ত্যেষ্টিতে গিয়েছেন ভারতের বিদেশসচিব এস. জয়শংকর। অশান্ত বাংলাদেশে, (Bangladesh unrest) ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক, ওসমান হাদি খুনে প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের লুকনো অবস্থায় বুধবারের ভিডিয়োবার্তা এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। ভারত নয়, বরং দুবাইয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে প্রধান অভিযুক্ত! রহস্যময় ভিডিয়োবার্তায় ওসমানের হত্যার জন্য জামাতকে দায়ী করলেন ফয়সাল। আর এই নিয়েই বর্ষশেষে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে।
ঠিক দুদিন আগেই বাংলাদেশের প্রশাসন দাবি করছিল যে প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই একটি ৪ মিনিট ১ সেকেন্ডের ভিডিয়োবার্তায় প্রকাশ্যে এলেন খোদ ফয়সাল। ভিডিয়োতে তাঁর দাবি, তিনি ভারতে নন, বরং বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি এই খুনের নেপথ্যে ‘জামাতের’ হাত রয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন।
ভিডিয়ো বার্তায় ফয়সালের দাবি: ষড়যন্ত্রের শিকার
খয়েরি রঙের হুডি পরা যুবক নিজেকে ফয়সাল করিম মাসুদ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগসূত্রই নেই। তিনি বলেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। এই মিথ্যা অভিযোগের কারণেই আমাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে’। তিনি আরও জানান যে, তাঁর কাছে দুবাইয়ের পাঁচ বছরের ‘মাল্টিপল এন্ট্রি’ ভিসা থাকা সত্ত্বেও দেশ ছাড়ার সময় তাঁকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে ঠিক কোন পথে বা কীভাবে তিনি বাংলাদেশে থেকে দুবাই পৌঁছালেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
হাদির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেন
ফয়সাল ভিডিয়োতে দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধী নন বরং একজন আইটি (IT) ব্যবসায়ী। তাঁর একটি নিজস্ব আইটি ফার্ম রয়েছে এবং এর আগে তিনি বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কাজ করেছেন। ওসমান হাদির সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কারণ ছিল ব্যবসায়িক। ফয়সালের ভাষ্যমতে, একটি কাজের বিষয়ে কথা বলতে তিনি হাদির অফিসে গিয়েছিলেন। হাদি তাঁকে কাজের আশ্বাস দিয়ে ৫ লক্ষ টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘ফান্ডিং’ বা অনুদান দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। ঘটনার আগের শুক্রবারেও তিনি হাদির অফিসে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন, তবে খুনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে তাঁর দাবি।
ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক টানাপোড়েন
হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বাংলাদেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হিংসা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকা। এই পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন ও ঢাকা পুলিশ দাবি করে যে, প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম ওরফে দাউদ খান এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখ মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছে।
তবে এই দাবিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয় যখন: ১. বিএসএফ (BSF) ও মেঘালয় পুলিশ: ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং মেঘালয় পুলিশ বাংলাদেশের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দেয়। তারা স্পষ্ট জানায়, অভিযুক্তদের ভারতে প্রবেশের কোনো প্রমাণ নেই এবং কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। ২. তথ্য-প্রমাণ: ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, অভিযুক্তরা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে—এমন দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বাংলাদেশ সরকার সরবরাহ করতে পারেনি।
জামাতের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ
ফয়সাল ভিডিয়োবার্তায় দাবি করেন যে, ওসমান হাদি আসলে জামাতেরই তৈরি করা নেতৃত্ব ছিলেন। তাঁর মতে, “এই হত্যাকাণ্ড জামাতই করিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে মোটরসাইকেলে যে দুজনকে দেখা গিয়েছে, সেখানে আমি বা আমার ভাই ছিলাম না”। এই অভিযোগ হাদি খুনের তদন্তকে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
পরিবারের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
ফয়সাল আরও অভিযোগ করেন যে, এই ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের ওপর চরম অত্যাচার ও হেনস্থা চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর পরিবার নির্দোষ এবং তাঁদের ওপর চালানো এই নিপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
ওসমান হাদির পরিবার ইতিমধ্যেই এই খুনের বিচার চেয়ে ড. ইউনূসের সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে। দেশের ভেতরে জনগণের ক্ষোভ সামাল দিতেই কি তড়িঘড়ি করে ‘ভারত যোগ’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছিল? ফয়সালের ভিডিওবার্তা প্রকাশিত হওয়ার পর এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযুক্ত যদি সত্যিই দুবাইয়ে থাকেন, তবে ভারতের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হতে পারে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের জট খোলার বদলে ফয়সাল করিমের ভিডিওবার্তায় তা আরও জটিল হয়ে উঠল। একদিকে প্রশাসনিক দাবি, অন্যদিকে প্রধান অভিযুক্তের সরাসরি ভিডিওবার্তা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সত্য উদ্ঘাটন এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযুক্তের দাবি সত্যি হলে, এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
(Feed Source: zeenews.com)
