Bangladesh Unrest: ইউনূসের উগ্রপন্থা! জামাতের চোখ রাঙানিতে বাংলাদেশে বাতিল ভাষাদিবসের ছুটি, কোপ হিন্দু উত্‍সবেও…

Bangladesh Unrest: ইউনূসের উগ্রপন্থা! জামাতের চোখ রাঙানিতে বাংলাদেশে বাতিল ভাষাদিবসের ছুটি, কোপ হিন্দু উত্‍সবেও…

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: একুশের ছুটি ‘উধাও’, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন ছুটির তালিকা ঘিরে উত্তাল পদ্মাপাড়।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। যে দিনটি বাঙালির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির বীজ বপনের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত, সেই ‘শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ কি এবার গুরুত্বহীন হতে চলেছে? ২০২৫ সালের শেষে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের যে ছুটির তালিকা প্রকাশ করেছে, তা নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা বাংলাদেশ। ছুটির তালিকার পাতায় কোথাও উল্লেখ নেই ২১শে ফেব্রুয়ারির লাল কালির ছুটির দিন। শুধু ভাষা দিবসই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় কোপ পড়েছে মে দিবস এবং সংখ্যালঘু হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একাধিক ধর্মীয় উৎসবের ছুটিতেও।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: কী আছে সেই তালিকায়?

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ছুটির তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ছুটি থাকবে ৬৪ দিন, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ১২ দিন কম। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কোন’ দিনগুলোর ছুটি বাদ গেছে সেই বিষয়টি। তালিকায় দেখা যাচ্ছে:

২১শে ফেব্রুয়ারি (শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস)

১লা মে (মে দিবস)

সরস্বতী পূজা, জন্মাষ্টমী, মহালয়া

বুদ্ধ পূর্ণিমা ও মধু পূর্ণিমা

শবে মিরাজ ও আশুরা

এই দিনগুলোতেও দেশের সব স্কুল-কলেজ খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে ২১শে ফেব্রুয়ারি বা ১৬ই ডিসেম্বরের মতো জাতীয় দিবসগুলো বিদ্যালয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘উদযাপন’ করতে হবে, কিন্তু ‘ছুটি’ শব্দটির অনুপস্থিতিই জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

ইতিহাস মোছার চক্রান্ত নাকি ‘সাপ্তাহিক ছুটি’র অজুহাত?

ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের পক্ষ থেকে একটি যুক্তি সাজানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পড়েছে শনিবার। বাংলাদেশে শুক্র এবং শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। যেহেতু ওই দিনটি এমনিতেই ছুটির দিন, তাই আলাদা করে তালিকায় তার উল্লেখ করা হয়নি।

তবে এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন ইতিহাসবিদ ও সচেতন নাগরিক সমাজ। তাঁদের পাল্টা যুক্তি হলো, ২০২৫ সালেও ২১শে ফেব্রুয়ারি শুক্রবার (সাপ্তাহিক ছুটি) পড়েছিল, কিন্তু তৎকালীন বিজ্ঞপ্তিতে দিনটিকে সগৌরবে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোনো জাতীয় দিবস পড়লে তার আলাদা উল্লেখ থাকাটাই দস্তুর, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম দিনটির তাৎপর্য ও গুরুত্ব বুঝতে পারে। সমালোচকদের দাবি, এটি কেবল একটি যান্ত্রিক ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট মুছে ফেলার একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া।

শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া

এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘এরা নির্বোধ এবং অশিক্ষিত। ২১শে ফেব্রুয়ারির জন্যই বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল। এনারা উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন।’

অন্যদিকে, গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী এই সিদ্ধান্তকে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। ইতিহাস ও ঐতিহ্য ওলট-পালট করার অধিকার তাদের নেই।’ অনেকের মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাসঙ্গিকতা কমানোর পর এবার ‘টার্গেট’ করা হয়েছে ভাষা আন্দোলনকে।

ধর্মীয় ও শ্রমিকের অধিকারে আঘাত

নতুন তালিকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় উৎসব যেমন সরস্বতী পূজা বা জন্মাষ্টমীর ছুটি বাতিল হওয়ায় ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মে দিবসের মতো বিশ্বজনীন শ্রমিকের অধিকারের দিনটিতেও স্কুল খোলা রাখার সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে মনে করছেন অনেকে। পাশাপাশি রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটিও কমিয়ে আনা হয়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে রমজান ও ঈদ মিলিয়ে ২৮ দিন ছুটি ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমিয়ে করা হয়েছে ১৯ দিন।

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বরদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। ইউনেস্কো এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাঙালির সংগ্রামকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই আন্দোলনের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ লুকিয়ে ছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর কট্টরপন্থী দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে বলে যে গুঞ্জন রয়েছে, এই ছুটি বাতিল সেই আশঙ্কাকেই আরও উসকে দিচ্ছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই ছুটির এই আমূল পরিবর্তন দেশের সামাজিক কাঠামোয় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক ভাষ্য ও অস্পষ্টতা

সাধারণত সরকারি ছুটির তালিকা মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়। বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, সংবাদ সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারির ছুটি বাতিলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে আগেভাগে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রজ্ঞাপন জারির পর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ দুই-ই বেড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি আবেগ এবং অস্তিত্বের লড়াই। ছুটির তালিকা থেকে এই দিনের নাম বাদ পড়া মানে কেবল একটি কর্মদিবস বেড়ে যাওয়া নয়, বরং একটি জাতির শিকড় থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হিসেবেই দেখছে সচেতন মহল। বিতর্কের এই জল শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

(Feed Source: zeenews.com)