সেলুলয়েডের সেরা ছবিতে তরুণ মজুমদারের স্মৃতি টুকু থাক

সেলুলয়েডের সেরা ছবিতে তরুণ মজুমদারের স্মৃতি টুকু থাক

দাদার কীর্তি (১৯৮০)

কি রে? এই কি তোর সেই ফেল দা? ইকনামিক্সে তিনবার ফেল করা ফুল দা কে নিয়ে সন্তুকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া অমূল্য থেকে পালের গোদা ভোম্বল দা, মিলিটারি মেজারের সরস্বতী থেকে সাদাসিধা বীনি, এই সবকিছুই অসাধারণ দক্ষতায় ক্যামেরার সামনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরিচালক তরুণ মজুমদার। পশ্চিমের পলাশ আর সেইসঙ্গে প্রথম পছন্দের সুরের সঙ্গে মিশেছিল একের পর এক ড্রামাটিক সিকোয়েন্স। কণকণে ঠাণ্ডায় বুক সমান জলে দাঁড়িয়ে কেদারকে সরস্বতীর মন্ত্র পাঠ করানোর সঙ্গে জ্বরের ঘোরে বিদ্যাদেবীর নাম নিয়ে ভুল বকা আর সেইসঙ্গে সত্যিকারের সরস্বতীর আগমন! এই রকম অভূতপূর্ব ভাবনা ১৯৮০ সালের আগে আর কেউ কতটা ভাবতে পেরেছিলেন বলে সন্দেহ দর্শক মহলের। এই সিনেমার হাত ধরেই বাংলা উপহার পেয়েছিল তার আগামী ‘হিরো’ তাপস পালকে। সিনেমার সঙ্গেই আজও সকলের মনে গেঁথে রয়েছে এর গান এবং প্রতিটি খুঁটিনাটি দৃশ্য।

 শ্রীমান পৃথ্বীরাজ (১৯৭৩)

শ্রীমান পৃথ্বীরাজ (১৯৭৩)

বরাবরই ছক ভাঙা ধারা পছন্দ করতেন তরুণ মজুমদার। যাবতীয় চেনা ছকের থেকে বিপরীতে হাঁটতেই পছন্দ করতেন তিনি। মাত্র সদ্য শৈশব পেড়িয়ে কৈশোরে পা রাখা দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে তখন সিনেমা তৈরি করা নিছক বালখিল্যতা বলেই মনে হত সকলের, যদি না সেই রথের সারথির নাম হত তরুণ মজুমদার। দুই অপরিনত বয়সের কাঁচা ভালোবাসাকে স্বামী-স্ত্রী’র পাকাপক্ত প্রেমে পরিণত করার দক্ষতা দেখা গিয়েছিল ছবির শেষ দৃশ্যে। রায় বাহাদুর খেতাবের লোভে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিপ্লব দমন করার বিরুদ্ধে তাঁর যে বিদ্রোহ তাও যে এত সহজ ভাবে উপস্থাপন করা যায় তাও হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন তিনিই। এছাড়াও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা আর সম্রাট পৃথ্বীরাজের মতই সংযুক্তাকে ছিনিয়ে আনার এই সাহস বাঙালি শিখেছে রসকে’র কাছ থেকেই।

 বালিকা বধূ (১৯৬৯, ১৯৭৬/হিন্দি)

বালিকা বধূ (১৯৬৯, ১৯৭৬/হিন্দি)

বাল্য বিবাহ একাধিকবার উঠে এসেছে পরিচালক তরুণ মজুমদারের গল্পে। আর এক বালিকাকে সামাজিক চাপে পড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করা, তারপর সংসার নামক বোঝা তার উপর চাপানোর চেষ্টা, স্বামী এবং স্ত্রীর সংজ্ঞা না বুঝেই সারাজীবনের এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার এই প্রথার নানা রমকের দিককে তুলে ধরে সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েই হয়ত সকলকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তিনি। নাবালক থেকে সাবালকের কোটায় দাঁড়িয়ে থাকা সরল এক মনে কোণার্কের রতিভাস্কর্য দেখে নিমেষে হওয়া প্রতিক্রিয়াকে তুলে ধরার মধ্যে দিয়েই দর্শকমন বুঝে গিয়েছিলেন পরিচালকের অসামান্যতা ঠিক কতটা। বাংলার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি রূপান্তরণে সেই নদীর চড়ে বসে চিনি আর অমলের গান আর আকাশের চাঁদ, ‘বড়ে আচ্ছে লগতে হ্যায়, ইয়ে ধরতি, ইয়ে নদীয়া, ইয়ে র‍্যায়না অউর?’ আর সেই আকাশবাণীর মত দূর থেকে ভেসে আসা ‘ও মাঝি রে…’ সেই আবহ কি কখনও ভুলতে পারবেন আপামর সিনেপ্রেমীরা?

গণদেবতা (১৯৭৮)

গণদেবতা (১৯৭৮)

তবে শুধুমাত্র প্রেমই নয়, এরই সঙ্গে দেশপ্রেমও বরাবর অগ্রাধিকার পেয়েছে তরুণ মজুমদারের প্রতিটি সৃষ্টিতে। ফল স্বরূপ আরও এক কালজয়ী সিনেমা গণদেবতা। কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা মূলত ১৯২০ সালের ইংরেজ শাসনে শিল্পায়ন প্রভাবে ও অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাংলার আর্থ-সামাজিক কাঠামো ধ্বংস হওয়ার কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে। দেবু পণ্ডিত রূপে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় এখনও তাঁর অন্যতম সেরা কীর্তি। ভারতের ২৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রতিযোগীতায় জনপ্রিয়তা ও সার্বিক মনোরঞ্জনের নিরিখে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল পরিচালককে। তাঁর এই অসামান্য কীর্তির সম্মান স্বরূপ হাওড়া থেকে আজিমগঞ্জ গামী ট্রেনের নাম ‘গণদেবতা’ রাখে ভারতীয় রেলওয়ে।

ভালোবাসা ভালোবাসা (১৯৮৫)

ভালোবাসা ভালোবাসা (১৯৮৫)

চিরন্তন তরুণ মজুমদারের সিগনেচার ফিল্মের মধ্যে একটি হল ভালোবাসা ভালোবাসা। তাপস পাল এবং দেবশ্রী জুটির এই সিনেমা নিঃসন্দেহে বাংলার আধুনিক লাভ স্টোরি। বয়ফ্রেন্ডের টেম্পো ঠেলা থেকে ফার্মে তার মুরগী ধরার মত কৌতুক দৃশ্য হোক কিংবা ‘চুরি করা মহা পুণ্য যদি পেটে সয়, এ জগতে বোকারাই সত্যবাদী হয়’এর মত বাস্তবচিত কিন্তু মজার ঘটনা তুলে ধরায় তাঁর জুরি আজও মেলেনি। কিন্তু আবার হাফ টাইমের পর থেকেই এই নিখাদ মজা নিমেষে বদলে যায় সিরিয়াস স্টোরি লাইনে, আর এই দিগন্তরেখা টানাতেও একচ্ছত্র স্বামী ছিলেন তরুণ মজুমদার।

ঠগিনী, পলাতক ও অন্যান্য

ঠগিনী, পলাতক ও অন্যান্য

মাত্র সেরা তালিকায় কখনওই তরুণ মজুমদারের এইসব কালজয়ী কীর্তিকে পরিমাপ করা প্রায় অসম্ভব। বাণিজ্যিক ভাবে অত্যন্ত সফল ছবির সঙ্গে সঙ্গেই সেলুলয়েডে এক অনন্য নজির তৈরি করেছিলেন তিনি। একদিকে যেখানে আংটি চাটুজ্জের ভাই-এর গল্প ধরা পড়েছে পলাতক’এ, অন্যদিকে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারানো বাবা মেয়ে আর কাকার নিরন্তর বেঁচে থাকার লড়াই আর তার জন্য ঠগবাজিকেই পেশা করে ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’ কনসেপ্টকে তুলে ধরা ‘ঠগিনী’ দুটই সমাজের দুটি আলাদা বাস্তবকে তুলে ধরে। আবার গ্রামীণ বাংলার কবিগানকে পরিচালক যেখানে তুলে ধরেছেন ‘ফুলেশ্বরি’তে, সেখানেই বাংলার কিংবদন্তী টপ্পা শিল্পী নিধুবাবুর জীবনী অসাধারণ দক্ষতায় উঠে এসেছে তাঁর ‘অমর গীতি’তে। গান গাওয়ার জন্য ত্যাজ্যপুত্র করে দেওয়ার পর অভিমানের ‘মেঘমুক্তি’ থেকে গান দিয়েই অজ পাড়া গাঁ-এর ব্যাথিত নারীদের আবার বেঁচে থাকার ‘আলো’ দেখানো, এই সবই যাঁর সৃষ্টি, আজ তিনিই চলে গেলেন ‘চাঁদের বাড়ি’তে। আর কখনও না মেটা ‘আলোর পিপাসা’ নিয়ে আপামর দর্শককুলের মুখে এখন একটাই কথা রয়ে গেল, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে নিও না সরায়ে’।

(Source: oneindia.com)