জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: নিউ ইয়র্কের আদালতে বন্দি মাদুরো- ক্ষমতাচ্যুতি থেকে মাদক পাচারের বিচার— উত্তাল বিশ্বরাজনীতি
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Nicolas Maduro) সোমবার নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে (NewYork Court) হাজির করা হয়েছে। গত শনিবার কারাকাসে মার্কিন কমান্ডোদের এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে সস্ত্রীক অপহৃত হওয়ার পর এই প্রথম জনসমুখে দেখা গেল তাঁকে। বর্তমানে তিনি ব্রুকলিনের বিতর্কিত মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রয়েছেন। এই অভিযানকে ভেনেজুয়েলার ওপর ওয়াশিংটনের আধিপত্য বিস্তারের পথ প্রশস্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৬৩ বছর বয়সী এই দক্ষিণ আমেরিকান নেতাকে হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া যানে করে নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাঁর সাথে ছিল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুলিসকর্তারা।
দেখুন সেই নৃশংস ভিডিয়ো
কমান্ডো অভিযান ও গ্রেফতারি
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আকাশ, জল ও স্থলপথে একযোগে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর ছত্রছায়ায় হেলিকপ্টার থেকে কমান্ডোরা নেমে প্রেসিডেন্ট প্যালেস সংলগ্ন এলাকা থেকে মাদুরো (৬৩) এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে (Celia Flores) (৬৯) তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের একটি মার্কিন রণতরীতে করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। এই অভিযানকে তেল-সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। হেলিকপ্টার থেকে নামা কমান্ডো, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর সহায়তায় চালানো সেই অভিযানের পর দু’জনকে প্রথমে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে এনে শনিবার রাতেই ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয় তাঁদের।
এই কারাগারটি ইতিমধ্যেই অমানবিক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগে বিতর্কিত। অতীতে এই জেলেই ছিলেন জেফ্রি এপস্টিন মামলার অভিযুক্ত ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েল, র্যাপ তারকা শন ‘ডিডি’ কম্বস থেকে শুরু করে হন্ডুরাসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ। বর্তমানে সেখানে বিচারাধীন রয়েছেন ইউনাইটেডহেলথ গ্রুপের এক কর্তা হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত লুইজি ম্যাঙ্গিওনেও।
২৫ পৃষ্ঠার বিস্ফোরক অভিযোগ
মার্কিন আদালতে জমা দেওয়া ২৫ পৃষ্ঠার চার্জশিটে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগগুলো হলো:
কোকেন পাচার: আন্তর্জাতিক মাদক কার্টেলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হাজার হাজার টন কোকেন যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের অভিযোগ।
হিংসা ও হত্যা: মাদক চক্রের টাকা আদায়ে বিরুদ্ধাচরণকারীদের অপহরণ, মারধর এবং খুনের নির্দেশ দেওয়া। এর মধ্যে কারাকাসের এক স্থানীয় মাদক সম্রাটকে হত্যার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
ঘুষের অভিযোগ: সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০০৭ সালে কয়েক লক্ষ ডলার ঘুষের বিনিময়ে তিনি এক শীর্ষ মাদক পাচারকারীর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার মাদকবিরোধী দপ্তরের প্রধানের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করেছিলেন।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী মাদকের টাকা পরিশোধ না করা বা তাঁদের মাদক পাচার অভিযানে বাধা দেওয়া ব্যক্তিদের অপহরণ, মারধর এবং হত্যার আদেশ দিতেন। এমনকি কারাকাসে একজন মাদক সম্রাটকে হত্যার পেছনেও তাঁদের হাত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়াও, মাদুরোর স্ত্রী ২০০৭ সালে এক বড় মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার মাদকবিরোধী দপ্তরের পরিচালকের সাক্ষাত করিয়ে দেওয়ার জন্য কয়েক লক্ষ ডলার ঘুষ নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের উভয়েরই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
আইনি লড়াই ও দায়মুক্তির প্রশ্ন
আদালতে মাদুরোর আইনজীবীরা এই গ্রেফতারিকে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ‘সার্বভৌম দায়মুক্তি’ (Sovereign Immunity) পাওয়ার কথা। তবে ১৯৯০ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাও একই যুক্তি দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাছাড়া, ২০২৪-এর বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকারই করে না। তাঁদের যুক্তি হবে যে, একজন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে মাদুরো বিচারের আওতামুক্ত (Immunity)। এর আগে ১৯৯০ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা মার্কিন সামরিক অভিযানে ধরা পড়ার পর একই যুক্তি দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকার করে না, বিশেষ করে ২০২৪ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর।
ট্রাম্পের হুঙ্কার ও বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দম্ভোক্তি করে জানিয়েছেন, ‘ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে।’ এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়ে পুতিনকে ‘তুলে নিয়ে আসার’ প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিলেও চীন এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি
মাদুরোর অবর্তমানে ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ডেলসি প্রথম দিকে মাদুরোর মুক্তি দাবি করলেও, বর্তমানে সুর নরম করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ‘সম্মানজনক সম্পর্ক’ ও ‘সহযোগিতার’ বার্তা দিয়েছেন।
মাদুরোর এই বিচার কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়, বরং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। বিতর্কিত ডিটেনশন সেন্টারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বন্দি এই নেতার ভবিষ্যৎ এখন নিউ ইয়র্কের আদালতের হাতে।
(Feed Source: zeenews.com)
