জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: নতুন বছরের শুরুতেই ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগের মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ (JeM)-এর প্রধান এবং রাষ্ট্রসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি মাসুদ আজহারের (Masood Azhar’s audio threat of suicide bombing) একটি কথিত অডিয়ো বার্তা সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। ওই অডিয়ো ক্লিপে আজহার দাবি করেছে যে, যে কোনো মুহূর্তে ভারতে হামলা চালানোর জন্য হাজার হাজার আত্মঘাতী জঙ্গি বা ‘ফিদায়েঁ’ প্রস্তুত রয়েছে। তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হুমকি আদতে জইশ প্রধানের ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক এবং সংগঠনের ভেঙে পড়া মনোবল চাঙ্গা করার এক মরিয়া চেষ্টা মাত্র।
‘হাজার নয়, সংখ্যাটা আরও বেশি’: আজহারের হুঁশিয়ারি
ফাঁস হওয়া ওই অডিয়ো রেকর্ডিংয়ে মাসুদ আজহারকে অত্যন্ত উসকানিমূলক ভাষায় কথা বলতে শোনা যায়। তার দাবি, বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী তার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে এবং তারা ভারতে অনুপ্রবেশের জন্য তাকে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আজহার বলে, “ইয়ে এক নেহি, দো নেহি, ১০০ নেহি, ইয়ে ১০০০ ভি নেহি, অগর পুরি তাদাদ বতা দুঁ, তো কল দুনিয়া কি মিডিয়া পর হাঙ্গামা মচ জায়েগা…” অর্থাৎ, তার বাহিনীর প্রকৃত সদস্য সংখ্যা প্রকাশ করলে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় পড়ে যাবে।
আজহারের দাবি অনুযায়ী, তার সংগঠনের জঙ্গিরা কোনো পার্থিব সুখ-সুবিধা চায় না, বরং তথাকথিত ‘শহাদত’ বা ‘মৃত্যুর পরের জয়’-ই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তবে এই অডিও রেকর্ডিংটি ঠিক কবেকার এবং এর সত্যতা কতটা, তা এখনো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হুমকির নেপথ্যে কি ভারতীয় আঘাতের আতঙ্ক?
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই আস্ফালনের মূলে রয়েছে চরম মানসিক বিপর্যয়। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটিগুলোতে ভারত যেভাবে লক্ষ্যমাত্রা-ভিত্তিক (Targeted) আঘাত হেনেছে, তাতে এই জঙ্গি সংগঠনটি কার্যত কোণঠাসা।
উল্লেখ্য, গত ২২ এপ্রিল পাহলগামে একটি বর্বরোচিত হামলায় ২৬ জন ভারতীয় বীর সেনানি শহিদ হয়েছিলেন। এর পাল্টা জবাবে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুরে জইশের সদর দপ্তরসহ একাধিক গোপন আস্তানায় বিধ্বংসী হামলা চালায়। ওই অভিযানে মাসুদ আজহারের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও প্রভাবশালী কমান্ডার নিহত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে এ ধরনের ‘ভয়েস ক্লিপ’ প্রচার করা জইশের পুরনো কৌশল।
প্ররোচনার নতুন হাতিয়ার: ‘মহিলা জিহাদি ব্রিগেড’
আজহারের এই অডিও বার্তার পাশাপাশি আরেকটি গোয়েন্দা রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, মাসুদ আজহার এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত হিন্দু মহিলাদের লক্ষ্য করে উসকানি দিচ্ছে। নারী শক্তিকে টার্গেট করে সে একটি ‘মহিলা জিহাদি ব্রিগেড’ তৈরির পরিকল্পনা করছে বলেও খবর। এটি ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামরিক কাঠামোর ওপর আঘাত হানার এক নতুন ষড়যন্ত্র বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০০১ সালের সংসদ হামলা থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের মুম্বই হামলা— ভারতের বুকে ঘটে যাওয়া একাধিক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের মাস্টারমাইন্ড এই মাসুদ আজহার। ২০১৯ সালে বাহাওয়ালপুরে তার গোপন আস্তানায় এক রহস্যজনক বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে সে অল্পের জন্য প্রাণ রক্ষা পায়। তারপর থেকেই আজহার কার্যত লোকচক্ষুর অন্তরালে। দীর্ঘ সময় তাকে জনসমক্ষে দেখা না গেলেও মাঝেমধ্যেই ডিজিটাল মাধ্যমে তার নামে উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানো হয়।
দিল্লি পুলিস সম্প্রতি রাজধানীর একটি বিস্ফোরণের (যেখানে ১৫ জন নিহত হয়েছিলেন) তদন্তে নেমে উমর মহম্মদ নামক এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার সাথে সরাসরি এই জইশ প্রধানের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। এর থেকেই স্পষ্ট যে, আত্মগোপন করে থাকলেও আজহার ভারতের মাটিতে নাশকতার জাল বোনা বন্ধ করেনি।
নিরাপত্তা সতর্কতা
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই অডিও বার্তাকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং স্পর্শকাতর শহরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা মহলের মতে, মাসুদ আজহারের এই ‘হাজার হাজার ফিদায়েঁ’ প্রস্তুত থাকার দাবিটি অতিরঞ্জিত হতে পারে, কিন্তু এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের জন্য একটি নতুন সতর্কবার্তা।
জইশ-ই-মহম্মদের মতো সংগঠন যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়, তখন তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তাই এই অডিও বার্তাকে জঙ্গি প্রধানের ‘আস্তিন থেকে বের করা শেষ তাস’ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
(Feed Source: zeenews.com)
