
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: করোনার (Corona Virus) পর আরেকটি সাংঘাতিক সাংঘাতিক ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এই রাজ্যে। নিপা ভাইরাসে (Nipah Virus) আক্রান্ত সন্দেহে বারাসাতের বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ২ নার্স। অসুস্থ এক নার্সের বাড়ি নদিয়া, আরেকজনের কাটোয়া। কল্যাণী এইমসে নমুনা পরীক্ষা, নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছে।
করোনার থেকেও ভয়ংকর নিপা ভাইরাস (Nipah virus)। কারণ, করোনার চেয়ে আলাদা এই ভাইরাসে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR) জানিয়েছে, করোনায় মৃত্যুর হার যেখানে ২-৩ শতাংশ ছিল, সেখানে নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে বর্তমানে মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ।
নিপা সংক্রমণের খবর সামনে আসতেই রাজ্যের তরফে দুটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে – ০৩৩২৩৩৩০১৮০ এবং ৯৮৭৪৭০৮৮৫৮। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলির জন্যও আলাদা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) তৈরি করা হচ্ছে।
এর আগে কেরালায় ছড়িয়েছিল ব্যাপকভাবে এই রোগটি। তবুও নিপা ভাইরাস সংক্রমণ এবং এর লক্ষণগুলি প্রতিরোধ ও পরিচালনা করার উপায়গুলি সম্পর্কে সচেতন হওয়া আমাদের সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিপা ভাইরাস সংক্রমণ পশু থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত রোগ। ১৯৯৮ সালে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হওয়ার পরে সংক্রামক ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়েছিল নিপা, মালয়েশিয়ার একটি গ্রামের নামানুসারে।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ একটি সংক্রামক রোগ
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে নিপা ভাইরাস প্রাণী (বাদুড় এবং শূকর) থেকে সংক্রামিত ফল বা কাঁচা খেজুরের রসের মতো সংক্রামিত পরিবেশগত দূষণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ভাইরাসটি লালা, প্রস্রাব এবং সংক্রামিত বাদুড়ের মলত্যাগের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়তে পারে। এইভাবে, বাদুড়ের লালা থেকে ভাইরাসযুক্ত ফল খেয়ে ব্যক্তি সংক্রামিত হতে পারে।
আপনি কী ভাবে বুঝবেন যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত?
নিপা ভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গ
ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৪ থেকে ১৮ দিন থাকে, তাই নিপাহ ভাইরাস আক্রমণ করার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা যেতে পারে। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ একটি অত্যন্ত সাংঘাতিক রোগ, যার মৃত্যু ঝুঁকি ৭৫%। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ভাইরাসটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ মানুষের শ্বাসযন্ত্র এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে এবং এই লক্ষণগুলি দেখায়-
জ্বর
মাথা ব্যাথা
মাথা ঘোরা
Disorientation (অসংলগ্ন আচরণ)
পেটে ব্যথা
বমি বমিভাব
পেশীতে ব্যথা
গলা ব্যথা ইনফ্লুয়েঞ্জা
নিপা এনসেফালাইটিসকে অন্যান্য এনসেফালাইটিস থেকে আলাদা করার জন্য ব্রেন এমআরআই করা হয়।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ কী ভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
এই রোগটি একজন সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সংক্রামিত ফল এবং দুর্বল স্বাস্থ্যবিধির মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। এখানে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রয়েছে যা আপনার অবশ্যই জানা উচিত-
১. এন্ডেমিক এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলুন
২. গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ফল এড়িয়ে চলুন
৩. কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলুন
৪. পাম গাছের কাছাকাছি তৈরি পানীয় এড়িয়ে চলুন
৫. মহামারী এলাকায় বাদুড় বা শুকরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন
৬. সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখুন,
৭. ঘন ঘন আপনার হাত ধুয়ে নিন
৮. সংক্রমিত ব্যক্তির কাছ থেকে কোয়ারেন্টাইন বজায় রাখুন
৯. অসুস্থ হলে বাড়িতেই থাকুন
১০. নিরাপদে খাবার খান করুন এবং রান্না করুন
১১. মৃতদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন
১২. নিপা সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে চুম্বন করা বা আলিঙ্গন করা এড়িয়ে চলুন।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ কী ভাবে চিকিত্সা করা হয়?
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ প্রাথমিকভাবে খুব যত্নের মাধ্যমে চিকিত্সা করা হয়। নিপা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনও অ্যান্টি-নিপাহ ভ্যাকসিন অনুমোদিত নেই। চিকিত্সার লক্ষ্য জ্বর এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্র এবং স্নায়বিক লক্ষণগুলি পরিচালনা করা।
নিপা ভাইরাসের মহামারী কীভাবে দমন করা যায়?
১. নিপা ভাইরাল মহামারীর জন্য সচেতন ও প্রস্তুত থাকা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
২. সংক্রামক ভাইরাস বাদুড় এবং তাদের মলমূত্রের মাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত হওয়ার সন্দেহ হয় এমন ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
প্রাথমিক সনাক্তকরণ:
সংক্রমণ এবং লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
যেহেতু বাদুড় পরিযায়ী, তাই রোগটি অন্যান্য ভৌগলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই নিবিড় নজরদারি জরুরি।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য হাসপাতালে নিরাপদ চিকিত্সা প্রয়োজন।
নিপা ভাইরাসের ধরন:
নিপা ভাইরাস এবং হেন্দ্রা ভাইরাস আরেকটি ভাইরাস যা হেপিনা ভাইরাস জিনাসের অন্তর্গত। ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং তিমুর-লেস্তে ফলের বাদুড়ের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। হেন্দ্রা (HENV) এবং নিপাহ (NIPV) ভাইরাসের ক্রস-প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি সহ একটি তদন্তমূলক সাবুনিট ভ্যাকসিন মানুষের সম্ভাব্য সুরক্ষা দেখায়।
খেজুরের কাঁচা রসকে নিপা ভাইরাসের প্রধান উৎস মনে করা হলেও কেবল এতেই সীমাবদ্ধ নয় এই ঝুঁকি। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত যে কোনো আধা-খাওয়ার ফলের মাধ্যমেও এই প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়াতে পারে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় আক্রান্ত মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরেও নিপা ভাইরাস সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তাই নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে খেজুরের কাঁচা রস এবং বাদুড়ের মুখ দেওয়া ফল খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংক্রমণের উৎস ও লক্ষণ
ডা. আরিফা আকরাম বলেন, নিপা একটি প্রাণীবাহিত ভাইরাস। মূলত ফলভোজী বাদুড়ের প্রস্রাব বা লালার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে অন্যরাও এতে সংক্রমিত হতে পারেন এবং এভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাধারণত প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যায়।
তবে রোগটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীর মাথা ঘোরা,
অস্বাভাবিক জল পিপাসা পাওয়া,
জ্ঞান হারিয়ে ফেলা
এমনকি অসংলগ্ন আচরণের মতো স্নায়ুবিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে
এছাড়া মস্তিষ্কের তীব্র সংক্রমণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে অধিকাংশ রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হন। এমনকি যারা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের সংক্রমণে ভুগতে পারেন।
এমনকি কোনও সুস্থ মানুষ নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে একেবারে উপসর্গবিহীন থেকে তার মারাত্মক মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিপা ভাইরাসের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে শূকর চাষিদের মধ্যে প্রথম নিপা ভাইরাস শনাক্ত হয়। সে সময় ২৮৩ জন আক্রান্তের মধ্যে ১০৯ জনই মারা যান।বাংলাদেশে ২০০১ সালে মেহেরপুরে প্রথম নিপা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় এবং ২০০৪ সালে নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই দেশে নিপা ভাইরাসের রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হল, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভারতে যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন।
পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ
ডা. আরিফা বলেন, নিপা ভাইরাস শনাক্ত করতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাব, রক্ত, সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড (RCR, ELISA, Culture) পরীক্ষা করা হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হওয়ায় সাধারণত বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। তবে সংগ্রহের সময় নমুনাগুলো যদি নিষ্ক্রিয় করা হয়, সেক্ষেত্রে এটি বায়োসেফটি লেভেল-২ পরীক্ষাগারে সাবধানতার সঙ্গে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
এখন পর্যন্ত নিপা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সচেতনতাই একমাত্র পথ।
কাঁচা রস বর্জন: খেজুরের কাঁচা বা অপরিষ্কার রস কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। কারণ এ রসের মাধ্যমে বাদুড়ের লালা বা মল থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে রস থেকে তৈরি গুড় নিরাপদ।
আধা-খাওয়া ফল: গাছ থেকে পড়া বা বাদুড়ের মুখ দেওয়া কোনো ফল (যেমন: বরই, পেয়ারা) খাওয়া যাবে না।
বুকের দুধ খাওয়ানো: কোনও মা নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হবে।
সরকারি পদক্ষেপ: প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসব করে খেজুরের রস খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এটা সরকারি ভাবে নিষেধ করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার ও সাধারণ মানুষের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণমাধ্যম, পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
ডা. আরিফা আকরাম বলেন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিপা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আইসোলেশন ও কন্টাক্ট ট্রেসিং নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সেবা বা জরুরি প্রয়োজনে আক্রান্ত রোগীর কাছে যেতে হলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে
নিয়মিত হাত ধোয়া
মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে
সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে এলে নিজেকে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শও দেন তিনি
(Feed Source: zeenews.com)
