জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: সাম্প্রতিক সময়ে কর্পোরেট জগতে সবচাইতে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবসম্পদ বিভাগ বা এইচআর (Human Resources)-এর প্রাসঙ্গিকতা।
প্রখ্যাত ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজিস্ট আমান্ডা গুডাল, যিনি সামাজিক মাধ্যমে ‘@thejobchick’ নামে পরিচিত, তার একটি সাম্প্রতিক পোস্টের মাধ্যমে এই বিতর্কের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। তার দাবি—একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য এইচআর বিভাগ যতটা না সহায়ক, তার চেয়ে অনেক বেশি বাধা।
বিতর্কের সূত্রপাত
আমান্ডা গুডাল তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এইচআর-এর সমালোচনা করে লিখেছেন,
‘এইচআর হল একমাত্র বিভাগ যারা সম্পূর্ণ অকেজো হয়েও পার পেয়ে যায়। তারা কোনও রাজস্ব (Revenue) তৈরি করে না, অন্তহীন নিয়মনীতির বেড়াজালে কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয় এবং কর্মীর বদলে কোম্পানিকে সুরক্ষা দেয়। তবুও তারা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে এমনভাবে উপস্থিত থাকে যেন তারা অপরিহার্য। কাল যদি ৯০ শতাংশ এইচআর বাদ দেওয়া হয়, তবে ব্যবসা আরও মসৃণ, দ্রুত এবং আনন্দদায়কভাবে চলবে।’
তার এই উস্কানিমূলক পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে বড় বড় কোম্পানিতে কর্মী ছাঁটাই চলছে এবং কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ক্ষোভের নেপথ্যে কারণ
কর্মীদের মধ্যে এইচআর-এর প্রতি এই ক্রমবর্ধমান বিরক্তির পিছনে বেশ কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে:
১. গত কয়েক বছরে গণছাঁটাইয়ের সময় এইচআর বিভাগই ছিল সেই ‘নিষ্ঠুর’ মুখ, যারা ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে কর্মীদের ছাঁটাই করেছে। কঠোরভাবে ‘রিটার্ন টু অফিস’ নীতি প্রয়োগ করা বা শৃঙ্খলার নামে জটিল কমপ্লায়েন্স তৈরি করা তাদের প্রতি সাধারণ কর্মীদের আস্থায় চির ধরিয়েছে।
২. গুডালের মতে, এইচআর কখনই কর্মীদের বন্ধু নয়। তাদের মূল কাজ হলো আইনি জটিলতা থেকে কোম্পানিকে রক্ষা করা। যখনই কর্মী এবং মালিকপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে, এইচআর সাধারণত মালিকপক্ষের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। এই কাঠামোগত বাস্তবতাই কর্মীদের মনে অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
৩. ব্যবসায়িক জগতে প্রতিটি বিভাগের সাফল্য সংখ্যা বা আয়ের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু এইচআর-এর কাজ সরাসরি কোনো মুনাফা আনে না। সমালোচকদের মতে, এইচআর কেবল প্রক্রিয়ার জটিলতা বাড়ায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমিয়ে দেয়।
এইচআর মহলের পাল্টা যুক্তি
এই আক্রমণের মুখে এইচআর পেশাদাররাও চুপ করে বসে নেই। তাদের মতে, এইচআর-এর সাফল্য অনেকটা ‘অদৃশ্য’। যদি একটি প্রতিষ্ঠানে বড় কোনও আইনি মামলা না হয়, কর্মক্ষেত্রে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় বা কোনো বিষাক্ত (Toxic) ম্যানেজারকে আগেভাগে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে তার কৃতিত্ব কেউ এইচআর-কে দিতে চায় না।
তাঁরা আরও দাবি করেন যে, ছাঁটাই বা বেতন সংক্রান্ত কঠোর সিদ্ধান্তগুলো আসলে উচ্চপদস্থ নির্বাহী বা বোর্ড মেম্বাররা নিয়ে থাকেন। এইচআর কেবল সেই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে। ফলে তারা বলির পাঁঠা হয়ে দাঁড়ান এমন সব কাজের জন্য, যা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত ছিল না।
গভীরতর সংকট
এই বিতর্ক আসলে কেবল একটি বিভাগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়, বরং আধুনিক কর্মক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং আস্থার সংকটের প্রতিফলন। যখন কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে আসে, তখন তারা তাদের ‘পিপল অপারেশন’ বা কর্মীদের কল্যাণে করা বিনিয়োগগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। অন্যদিকে, কর্মীরা নিজেদের কেবল একটি ‘রিসোর্স’ বা সংখ্যা মনে করতে শুরু করলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের মমতা হারিয়ে যায়।
আমান্ডা গুডালের ‘৯০ শতাংশ এইচআর ছাঁটাই’ করার পরামর্শটি হয়তো আক্ষরিক অর্থে সম্ভব নয়, কিন্তু এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। আধুনিক এইচআর বিভাগকে কেবল ‘পুলিশিং’ বা নিয়মনীতিতে আটকে থাকলে চলবে না; তাদের প্রকৃত অর্থেই কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
এইচআর কি আসলেই অপ্রয়োজনীয় নাকি তারা একটি প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড—এই বিতর্কের শেষ নেই। তবে আমান্ডা গুডালের এই বিতর্কিত পোস্টটি প্রমাণ করেছে যে, কর্পোরেট বিশ্ব এবং সাধারণ কর্মীদের মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান বাড়ছে। এইচআর যদি নিজেদের ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে চায়, তবে তাদের কেবল ‘কোম্পানির রক্ষক’ হিসেবে নয়, বরং ‘মানুষের প্রতিনিধি’ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।
(Feed Source: zeenews.com)
