জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মাদ্রাজ হাইকোর্ট সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে যে, জনবসতিপূর্ণ এলাকা বা জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় কোনো ধরনের জবরদখল বরদাস্ত করা হবে না, এমনকি সেই দখলদারির সঙ্গে যদি ধর্মীয় পরিচয়ও জড়িয়ে থাকে। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাস্তার কোনো ধর্মীয় চরিত্র নেই এবং সরকারি জমিতে থাকা অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের দায়িত্ব।
জনসাধারণের রাস্তায় ধর্মীয় মূর্তি সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ মাদ্রাজ হাইকোর্টের
মামলার প্রেক্ষাপট:
শরৎ নামক এক ব্যক্তি মাদ্রাজ হাইকোর্টে একটি আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, ২০২৪ সালে তিনি একটি সম্পত্তি ক্রয় করেন। সেই বাড়ির মেরামতের কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, তাঁর বাড়ির প্রবেশপথের ঠিক সামনেই ‘মাতা ভেলাঙ্কানি’-র একটি মাজার বা উপাসনালয় স্থাপন করা হয়েছে। শরতের অভিযোগ ছিল যে, এই কাঠামোর কারণে, তাঁর বাড়িতে ঢোকার প্রধান পথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী পথচারীদেরও চরম অসুবিধা হচ্ছে। এছাড়া অভিযোগ তোলা হয় যে, পাশের একটি বাড়ি থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ওই উপাসনালয়টি চালানো হচ্ছিল।
বিপক্ষ পক্ষের যুক্তি:
মামলায় একজন ব্যক্তি নিজেকে যুক্ত করে দাবি করেন যে, তিনি ১৯৯৫ সালে ওই মাজারটি স্থাপন করেছিলেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এটি স্থানীয় মানুষের কাছে বিশ্বাস, আশা এবং আবেগীয় শক্তির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন যে, এতদিন পর্যন্ত এই উপাসনালয়টি নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। এখন এটি সরিয়ে দিলে ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন যে, আবেদনকারী শরৎ নিজেই তার সম্পত্তিটি অবৈধ বার বা বেআইনি কাজে ব্যবহার করছেন এবং হিন্দু ধর্মের গণেশ মন্দিরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না তুলে শুধুমাত্র এই খ্রিস্টান উপাসনালয়টিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ:
বিচারপতি ভি. লক্ষ্মীনারায়ণনের একক বেঞ্চ উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পর এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন:
১. রাস্তার কোন ধর্ম নেই: আদালত জানায় যে, একটি রাস্তা বা গলি জনসাধারণের চলাচলের জন্য, এর কোনো ধর্মীয় চরিত্র থাকতে পারে না। উপরিউক্ত কাঠামোটি কী ধরনের বা কোন ধর্মের, সেটি বিচার্য বিষয় নয়; যদি সেটি জবরদখল করে তৈরি করা হয়, তবে তা অবশ্যই সরাতে হবে।
২. সরকারি জমি দখল: নথিপত্র খতিয়ে দেখে আদালত নিশ্চিত হয় যে, উপাসনালয়টি প্রায় ৮ বর্গমিটার সরকারি রাস্তার ওপর (Sarkar Poramboke Street) তৈরি করা হয়েছে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের নজির: আদালত উল্লেখ করে যে, সুপ্রিম কোর্ট আগেই জানিয়েছে যে কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের রাস্তায় ধর্মীয় কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন না। ধর্মীয় অনুভূতি বা সেন্টিমেন্টকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি জমিতে অবৈধ দখলদারি বজায় রাখা আইনত সম্ভব নয়।
৪. কমিশনারের দায়িত্ব: ‘লোকাল বডিস অ্যাক্ট’-এর ১২৮ ধারা অনুযায়ী, জনসাধারণের জায়গা থেকে যেকোনো ধরনের জবরদখল সরিয়ে দেওয়া মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের আইনি দায়িত্ব। এই মামলায় দেখা গেছে যে, আঞ্চলিক ডেপুটি কমিশনার ইতিপূর্বেই আইন মেনে নোটিশ জারি করেছিলেন।
আদালতের রায়:
আদালত আবেদনকারী শরতের পক্ষে রায় দিয়ে জানায় যে, যেহেতু মূর্তিটি পাবলিক রোডের উপর, তাই তিনি এটি সরানোর দাবি করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। আদালত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় যে, ওই অবৈধ কাঠামো সরানোর জন্য তারা যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।
অন্যদিকে, শরতের সম্পত্তির অবৈধ ব্যবহার (যেমন বেআইনি বার বা বাজি কেনাবেচা) নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে আদালত জানায় যে—যদি শরতের সম্পত্তি কোনো বেআইনি কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে বিপক্ষ পক্ষ আইন অনুযায়ী আলাদাভাবে মামলা বা ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু সেই অজুহাতে রাস্তার ওপর থাকা অবৈধ মাজারটির দখলদারিকে বৈধতা দেওয়া যাবে না।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই রায় পুনরায় মনে করিয়ে দিল যে, আইনের চোখে জনস্বার্থ এবং সরকারি জমি রক্ষা যে কোনও ব্যক্তিগত ধর্মীয় আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অধিকার সুনিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রাথমিক কর্তব্য।
(Feed Source: zeenews.com)
