জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: অন্ধকারে ইউপিআই: থমকে গেল ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার চাকা…
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত ডিজিটাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ‘ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ (UPI) এক নজিরবিহীন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই ব্যবস্থা হঠাৎ অচল হয়ে পড়ায় সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরো বিক্রেতা—সবাই চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের ফলে ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির গতি মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত ও ব্যাপ্তি
মঙ্গলবার বিকেলের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আউটজ ট্র্যাকারগুলোতে অভিযোগের পাহাড় জমতে শুরু করে। ব্যবহারকারীরা জানান, গুগল পে (Google Pay), ফোনপে (PhonePe) এবং পেটিএম (Paytm)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় ইউপিআই অ্যাপগুলো কাজ করছে না। কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করার সময় বা অর্থ স্থানান্তরের সময় বারবার ‘সার্ভিস প্রোভাইডার নট অ্যাভেলেবল’ (Service Provider Not Available) বা ‘ব্যাঙ্ক সার্ভার ডাউন’-এর মতো মেসেজ আসতে থাকে।
বিপর্যয়ের আঁচ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, কলকাতা, হায়দ্রাবাদ এবং বেঙ্গালুরুর মতো মেগাসিটিগুলোতে। অনেক ব্যবহারকারী একাধিক ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করেও সফলভাবে লেনদেন করতে পারেননি। এর ফলে দোকানদাররা অনলাইনে পেমেন্ট নিতে অস্বীকার করেন এবং অনেক গ্রাহককে পণ্য কেনা বা যাতায়াতের ভাড়া মেটাতে অসুবিধায় পড়তে হয়।
জনজীবনে প্রভাব: নগদই যখন একমাত্র ভরসা
২০২৬ সালের মধ্যে ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ লেনদেন ডিজিটাল হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পকেটে নগদ টাকার পরিমাণ কমেছে। এই হঠাৎ নেমে আসা বিপর্যয় সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে সামনে এনেছে। অনেক ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং ছোট মুদি দোকানে দেখা গেছে যে, গ্রাহকরা পণ্য নিয়ে কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকলেও ইউপিআই কাজ না করায় তারা শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরছেন। ট্যাক্সি বা অটো চালকদের ভাড়া মেটানোর সময় ইউপিআই-এর ওপর নির্ভরশীল যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়েন। যারা ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড বহন করেন না, তাদের জন্য নগদ টাকাই ছিল এই অন্ধকার সময়ে একমাত্র ভরসা।
এনপিসিআই (NPCI) এবং বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
ইউপিআই-এর চালিকাশক্তি ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ (NPCI) এই বিভ্রাট সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো কারণ জানায়নি। তবে প্রাথমিক সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় পেমেন্ট গেটওয়েতে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা সার্ভার ওভারলোডের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, ইউপিআই ব্যবস্থার ওপর দেশের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত প্রসারের বিপরীতে পরিকাঠামো বা ব্যাক-এন্ড সাপোর্ট কতটা শক্তিশালী, এই বিপর্যয় সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগেও ২০২৫ সালে কয়েকবার ইউপিআই বিভ্রাট ঘটেছিল, তবে ২০২৬-এর এই ঘটনাটি তার ব্যাপ্তি এবং সময়ের গুরুত্বের দিক থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ বলে মনে করা হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী?
এই পরিস্থিতিতে ব্যাঙ্কগুলো গ্রাহকদের বিকল্প হিসেবে ‘ইউপিআই লাইট’ (UPI Lite) ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে, যা ইন্টারনেট ছাড়াই ছোট অঙ্কের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে। তবে বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে নেট ব্যাঙ্কিং বা সরাসরি কার্ড ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
ভারতের ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ মিশনের সাফল্যের অন্যতম প্রতীক হলো ইউপিআই। কিন্তু এই ধরনের ব্যাপক বিপর্যয় ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। ভারত যখন ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির মঞ্চে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে, তখন ইউপিআই-এর মতো অপরিহার্য পরিষেবাকে ‘জিরো-ডাউনটাইম’ (Zero-downtime) বা নিরবচ্ছিন্ন করার দাবি এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। আগামীতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে এনপিসিআই এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আরও কঠোর পরিকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
(Feed Source: zeenews.com)
