
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে (Bangladesh Politics) এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (Bangladesh Election)। শেখ হাসিনা সরকারের (Sheikh Hasina) পতনের পর এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা নিয়ে কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ব্যাপক কৌতূহল সঙ্গে উদ্বেগেরও সৃষ্টি হয়েছে। ভোটের মাত্র দু’দিন আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য উইক’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন সংস্থার জনমত সমীক্ষা- বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) BNP এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের (Bangladesh Jamaat-e-Islami) মধ্যে।
সমীক্ষার ফলাফল: কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বর্তমানে দুটি ভিন্নধর্মী জরিপ সামনে এসেছে। একটি পরিচালনা করেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি’ (IILD) এবং অন্যটি ‘এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ (EASD)।
IILD-এর জরিপ অনুযায়ী, লড়াই হবে অত্যন্ত সমানে-সমান। তাদের তথ্যমতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট ৪৪.১ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকলেও ১১টি দলের সমন্বয়ে গঠিত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ৪৩.৯ শতাংশ ভোট পেতে পারে।
আসনের হিসেবে জামায়াত জোট ১০৫টি আসনে এবং বিএনপি জোট ১০১টি আসনে সুনিশ্চিত জয়ের পথে রয়েছে। তবে ৭৫টি আসনে দুই জোটের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।
অন্যদিকে, EASD-এর জরিপ বিএনপি-র জন্য অনেক বেশি ইতিবাচক। এই জরিপ অনুযায়ী, বিএনপি জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।
তাদের মতে, জামায়াত জোট মাত্র ৪৬টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। এই জরিপে আরও দেখা গেছে যে, ৬৬.৩ শতাংশ সাধারণ ভোটার রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি-কেই তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যেখানে জামায়াতের পক্ষে সমর্থন মিলেছে ১১.৯ শতাংশ।
ভারতের আগ্রহ ও কৌশলগত অবস্থান
বাংলাদেশের এই নির্বাচন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী দিল্লি, দীর্ঘকাল ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে হিসেব-নিকেশ শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ‘লিবারেল-সেন্ট্রিস্ট’ বা উদার-মধ্যপন্থী জায়গাটি দখল করে নিয়েছে, যা আগে আওয়ামী লীগের অধীনে ছিল।
ভারতের জন্য স্বস্তির বিষয় হল, বিএনপি তাদের অবস্থানে আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী ও উদারমনা। যদিও তারা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ অর্থাত্ বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে, এবং ‘বন্ধুত্বে হ্যাঁ কিন্তু প্রভুত্বে না’ মূলত এই স্লোগান নিয়েই এগোচ্ছে। তবুও এই প্রেক্ষাপটে তারা ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে, গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক- ভারতের রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক বার্তাই দিয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত ছাত্রদল সমর্থিত দলগুলোর কট্টর ভারত-বিরোধী অবস্থান দিল্লির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ। নির্বাচনের ফলাফলে যদি জামায়াত জোট শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব একটা ভালো ইঙ্গিত নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী সমীকরণ ও জনমতের প্রতিফলন
বাংলাদেশের ৩৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩০০টিতে সরাসরি ভোটগ্রহণ হবে। অবশিষ্ট ৫০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন, প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ভাগ হবে। হিসেব বলছে, ছোট দলগুলো- যেমন জাতীয় পার্টি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এবার খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না। মূল লড়াই হবে দুই প্রধান জোটের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর একটি ইচ্ছে দেখা যাচ্ছে। তবে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এই সমস্যা ভারতের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে।
ভারতের কৌশল হবে যেকোন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তবে জামায়াতের চেয়ে বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়কে দিল্লির জন্য তুলনামূলকভাবে স্বস্তিপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ১০ ফেব্রুয়ারির রাজনৈতিক সমীক্ষা বলছে, ভোটের পাল্লা বিএনপির দিকেই ভারি, তবে শেষ মুহূর্তের ভোটযুদ্ধ এবং ৭৫টি অনিশ্চিত আসনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে কে বসবেন ঢাকার মসনদে।
(Feed Source: zeenews.com)
