‘আমি সেই ভারতের নাগরিক…’, লোকসভায় অভিষেকের মুখে বীর দাসের কবিতা, দেখালেন ‘টু ইন্ডিয়া’র ছবি

‘আমি সেই ভারতের নাগরিক…’, লোকসভায় অভিষেকের মুখে বীর দাসের কবিতা, দেখালেন ‘টু ইন্ডিয়া’র ছবি
কলকাতা: লোকসভার ভাষণে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকারকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের। বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা করতে গিয়ে ‘Two India’ তত্ত্ব তুলে ধরেন অভিষেক, যে কবিতা পাঠ করে দক্ষিণপন্থীদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন কৌতুকশিল্পী বীর দাস। নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে এদিন, সেই কবিতাকেই হাতিয়ার করেন অভিষেক। (Abhishek Banerjee)

মঙ্গলবার লোকসভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রথমেই বাজেট ঘোষণা নিয়ে কটাক্ষ ছুড়ে দেন অভিষেক। বাজেট ঘোষণা করতে গিয়ে নির্মলা সীতারামন ৮৫ মিনিট ধরে বক্তৃতা করলেও, একটি বারের জন্যও যে পশ্চিমবঙ্গের নাম মুখে আনেননি, পুরনো ঘোষণাকে নতুন বলে চালিয়ে দিয়েছেন, সেকথা তুলে ধরেন তিনি। বকেয়া টাকা আটকে রেখে বাংলাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন। (Vir Das Two India Poem)

আর সেই প্রসঙ্গেই বীরের কবিতার আশ্রয় নেন অভিষেক। ২০২১ সালে আমেরিকার কেনেডি সেন্টারে যে কবিতা পাঠ করে খবরের শিরোনামে উঠে আসেন বীর, যে কবিতার জন্য দক্ষিণপন্থীদের আক্রমণের শিকার হন বীর, সেটিরই উল্লেখ করেন তিনি। অভিষেক বলেন, “আমি এমন ভারতের নাগরিক, যেখানে একদিকে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ’ ভারতের প্রচার হয়, আর অন্য দিকে মাতৃভাষা কাউকে সন্দেহের পাত্র করে তোলে। বাংলায় কথা বললে কেউ বাংলাদেশি হয়ে যান, মাছ খেলে মুঘল বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়।”

অভিষেক আরও বলেন, “আমি সেই ভারতের নাগরিক, যে ভারত বিপ্লবীদের জন্ম দিয়েছে, রক্তে সাহসের সঞ্চার করেছে। আবার সেই ভারতেই ‘জয় বাংলা’ বলা, ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বলে বুক চাপড়ানো হয়, আবার সেই ভারতেই পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য বকেয়া , ১.৯৬ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রাখা হয়। শুধু টাকা আটকে রাখা হয়নি, উৎকর্ষতা আটকে দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেক ভারতীয় এবং প্রত্যেক রাজ্যের সমানাধিকারের যে বিধান রয়েছে সংবিধানে, তা আটকানো হয়েছে। এটা শাসনকার্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নয়, এটা একটা বার্তা যে, লাইনে না এলে মূল্য চোকাতে হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই মুহূর্তে ভারতের দু’টি চেহারা, একটি ভারতকে অন্য ভারতের সামনে মাথানত করতে বলা হচ্ছে। এটাই সত্য।”

নির্মলাকে নিশানা করে অভিষেক বলেন, “আমি এমন ভারতের নাগরিক, যেখানে অর্থমন্ত্রী গর্ব সহকারে ঘোষণা করেন যে, ভারত সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। আবার এই ভারতেই সাত বছরে ৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা করের জোগান দিয়ে, সেখান থেকে নিজের অধিকারের ভাগ পায় না বাংলা। বার বার অনুরোধ, আর্জি জানিয়েও, ১০০ দিনের কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে আমাদের, আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক প্রকল্প, এমনকি ‘জল জীবন মিশনের’ আওতায় পানীয় জলের অধিকারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন ভারতের নাগরিক আমি, যেখানে সুশাসনের প্রচার করা হয়। কিন্তু এই ভারতেই পরিত্যাগ করা হয়, দরিদ্র মানুষকে রোটি-কপড়া-মকানের জন্য লড়াই করতে হয়। আমি এমন ভারতের বাসিন্দা, যেখানে রাজধানীতে পেরেক পুঁতে, কংক্রিটের বেড়া তুলে কৃষকদের আন্দোলন আটকে দেওয়া হয়। আবার এই ভারতেই জঙ্গিরা রাজধানীতে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পারে। আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে সর্বোচ্চ দফতর থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, দেশের সীমান্ত নিরাপদ, লঙ্ঘন করা যাবে না। আবার সেই ভারতেই প্রতিশ্রুতি ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। সন্ত্রাসবাদীরা সীমান্ত টপকে ঢুকে পড়ে, নিরাপত্তার বেড়াজাল এড়িয়ে পহেলগাঁওয়ে ঢুকে পড়ে এবং ২৬ জন নিরীহ নাগরিককে প্রকাশ্য দিনের আলোয় হত্যা করে।”

এর কোনওটাই দুর্ঘটনা নয়, বরং কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট-নীতিতেই এর কারণ লুকিয়ে বলে দাবি করেন অভিষেক। চায়ের বিস্কিট থেকে স্নান করার সাবান, সর্বত্র GST চাপানো নিয়ে আক্রমণ শানান অভিষেক। তাঁর দাবি, ঝাঁ চকচকে ট্রেনের স্বপ্ন দেখানো হলেও, রেলের সুরক্ষায় মাত্র ৪ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ করে কেন্দ্র। সাধারণ মানুষকে আয়কর, সড়ক কর আবার টোল ট্যাক্সও দিতে হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হচ্ছে ভারতের শিরদাঁড়া, অথচ এই শিল্পের জন্য খাতায়-কলমে কর ছাড়ের কথা হয়, কার্যকর হয় না। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পায় না ভারতের কৃষকরা। ১ লক্ষের বেশি কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, আমরা এমন ভারতে বাস করি। বিজেপিতে ২০ থেকে ২৫ জন যোগদান করেছেন, যাঁরা দুর্নীতিতে জড়িত, অথচ প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘খাবও না, কাউকে খেতেও দেব না’। SIR নিয়েও এদিন প্রশ্ন তোলেন অভিষেক। নাগরিকদের নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে হলে, তাঁদের ভোটে নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায় বলে মন্তব্য করেন অভিষেক।

এদিন লোকসভায় বীর দাসের যে কবিতার আশ্রয় নেন অভিষেক, সেই নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এমনকি বীরের দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। যদিও আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল সেই কবিতা, যাতে বীর লেখেন—

‘আমি কোন ভারতের নাগরিক?…আমি… আমি দু’টি ভারতের নাগরিক।

সেই দুই ভারতই এখন আমার সঙ্গে এই মঞ্চে।

আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে মাস্ক পরিহিত শিশুরা পরস্পরের হাত ধরে…আবার সেই ভারতেই নেতারা মাস্ক ছাড়া পরস্পরকে আলিঙ্গন করেন।

আমি সেই ভারতের নাগরিক যেখানে AQI ৯০০০, তার পরও ছাদে ঘুমাই আমরা, আকাশের বুকে নক্ষত্র দেখি।

আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে দিনের বেলা মহিলাদের পুজো করা হয়, আর রাত হলেই গণধর্ষণ করা হয়।

আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে বলিউড, ট্যুইটার নিয়ে আমরা দ্বিখণ্ডিত, আবার থিয়েটারের অন্ধকারে সেই বলিউড দ্বারাই ঐক্যবদ্ধ।

আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে যৌনতা নিয়ে ছুঁৎমার্গ, আবার ১০০ কোটির সংখ্যা ছুঁতে সঙ্গমে লিপ্ত হই…।

(Feed Source: abplive.com)