জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
আর এই নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরেই অভিনন্দন জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল আসার পরপরই তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘শুভনন্দন’ (শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন) জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এক বার্তায় এই শুভেচ্ছা জানান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার বার্তায় বিশেষভাবে তারেক রহমানকে ‘তারেক ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভের জন্য বিএনপি এবং তারেক ভাইকে আমার আন্তরিক শুভনন্দন। বাংলাদেশের মানুষের এই রায় গণতন্ত্রের প্রতি তাদের গভীর আস্থার প্রতিফলন।’
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আমাদের দুই বাংলার মধ্যে যে সাংস্কৃতিক ও আত্মিক বন্ধন রয়েছে, তা আগামী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী হবে। আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ শান্তি, উন্নয়ন এবং সৌহার্দ্যের পথে একসঙ্গে এগিয়ে যাব।’
নির্বাচনী ফলাফল ও প্রধান দলগুলোর অবস্থান:
এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২১২ আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী মাত্র ৭৭ আসন পেয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তারা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ১৮১ থেকে ২০৩টি আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী ৬৮ থেকে ৭০টি আসনে জয়ী হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় মূলত লড়াই ছিল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কার:
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এদিন একটি ঐতিহাসিক জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘জুলাই চার্টার’ বা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর এই গণভোট নেওয়া হয়। প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, অধিকাংশ ভোটার এই সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এই সংস্কারের ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা (সর্বোচ্চ ১০ বছর) নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ ও ভোটার উপস্থিতি:
বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় ২০২৬ সালের এই নির্বাচন ছিল অনেকাংশেই শান্তিপূর্ণ। নয় লাখেরও বেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকায় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ, যা ২০০৮ সালের নির্বাচনের চেয়ে কিছুটা কম হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় সন্তোষজনক। তবে অনেক এলাকায় ভোটারের লাইন দেখা গেলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে ‘পরিকল্পিত প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং একটি নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
বিএনপির এই বিশাল বিজয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম দিককার নেতাদের মধ্যে একজন, যিনি তারেক রহমানকে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ অভিনন্দন জানিয়েছেন। মোদী তার বার্তায় বলেন, ‘ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। এই বিজয় বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন। ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’
এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানও নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ভারতের এই অভিনন্দনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও আগামীর চ্যালেঞ্জ:
দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান এবারই প্রথম সরাসরি দলের নেতৃত্ব দিয়ে বড় সাফল্য পেলেন। নির্বাচনে জয়ের পর তিনি সমর্থকদের সংযম প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং কোনো ধরনের বিজয় মিছিল না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল বিএনপির জয় নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জয়।
তবে নতুন সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ২০২৪-এর পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। বর্তমানে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে সংকট রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য বড় পরীক্ষা হবে। দ্বিতীয়ত, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা, যা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
২০২৬ সালের এই সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘পলিটিক্যাল রিসেট’ বা রাজনৈতিক পুনর্গঠন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট স্পষ্ট—তারা পরিবর্তন চায়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন কতটুকু স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে এবং ড. ইউনূসের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করে, তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে সারা বিশ্ব। সব মিলিয়ে, এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যালটের মাধ্যমে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হল।
(Feed Source: zeenews.com)
