)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। এই প্রযুক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে এবং ডিজিটাল বিপ্লবের নতুন অধ্যায় সূচনা করতে ভারত সরকার আয়োজন করেছে তিন দিনব্যাপী ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’। দিল্লির প্রগতি ময়দানের হাই-টেক ‘ভারত মণ্ডপমে’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। তবে উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির এই উৎসব ছাপিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের উপস্থিতি এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন বিতর্ক।
এক সম্মেলনে দুই মেরু: জৌলুস ও জল্পনা
নয়াদিল্লির এই সম্মেলনে যোগ দিতে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের ৬৫টি দেশের প্রতিনিধি। আমন্ত্রিতদের তালিকায় রয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস লুলা দা সিলভার মতো রাষ্ট্রনেতারা। প্রযুক্তি বিশ্বের মহারথী সুন্দর পিচাই, স্যাম অল্টম্যান এবং ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানীও উপস্থিত আছেন। কিন্তু এত সব নক্ষত্রের মাঝেও আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন বিল গেটস। তবে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে গত কয়েকদিনে যে নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
এপস্টেইন ফাইলস: যে বিতর্কের কারণে নাম কাটা পড়ল
সম্মেলনের মূল ‘গ্লোবাল ভিশনারিজ’ তালিকায় বিল গেটসের নাম জ্বলজ্বল করলেও, মঙ্গলবার হঠাৎ দেখা যায় তাঁর নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কুখ্যাত ‘এপস্টেইন ফাইলস’। ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে দাবি করা হয়েছে, বিল গেটসের নাম সেই বিতর্কিত ডায়েরিতে একাধিকবার উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়ান মহিলার সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টাও করেছিলেন।
ভারত সরকার এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। সূত্রের খবর, নয়াদিল্লি মনে করে যে প্রযুক্তির উৎকর্ষের চেয়েও নারী অধিকার এবং নৈতিক মর্যাদা রক্ষা করা বেশি জরুরি। এপস্টেইন কাণ্ডের নির্যাতিতাদের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানাতেই সম্ভবত আমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও মূল তালিকা থেকে গেটসের নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উপস্থিতি নিয়ে চরম ধোঁয়াশা ও ফাউন্ডেশনের বক্তব্য
নাম বাদ পড়ার পর থেকেই জল্পনা শুরু হয় যে গেটস কি তবে সম্মেলনে থাকছেন না? গেটস দু’দিন আগেই ভারতে এসে পৌঁছালেও তাঁর যোগ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে আসরে নামে ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, বিল গেটস পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সম্মেলনে যোগ দেবেন। তাদের দাবি, ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রতিষ্ঠিত অভিযোগের কারণে বৈশ্বিক উন্নয়নের কাজ থমকে যাওয়া উচিত নয়। বিল গেটসের মুখপাত্র এই অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ও ‘এআই ফর সোশ্যাল গুড’
সব বাধা কাটিয়ে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিল গেটসের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ‘এআই ফর সোশ্যাল গুড’ বা সামাজিক কল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ভারত সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গেটসের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে এআই-এর প্রয়োগ নিয়ে গেটস বড় কোনো বিনিয়োগের ঘোষণা দিতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর: জি২০-এর সমতুল্য প্রস্তুতি
বিশ্বের এত ভিভিআইপিদের নিরাপত্তায় কোনো ত্রুটি রাখেনি কেন্দ্র সরকার। ভারত মণ্ডপম এবং তার আশপাশের এলাকা ৫০০-এর বেশি সিসিটিভি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হয়েছে। আকাশে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং ১০০ জন বিশেষ পুলিশ সদস্যের টিম ভিভিআইপিদের হোটেলের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। কার্যত ২০২৪ সালের জি২০ সম্মেলনের মতোই কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পড়েছে দিল্লি।
ভারতের আপসহীন অবস্থান
‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’ কেবল ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে ভারতের নৈতিক অবস্থানেরও পরীক্ষা। একদিকে উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য বিল গেটসের মেধার মূল্যায়ন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নাম তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া—ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে যে তারা প্রযুক্তিতে আধুনিক হলেও আদর্শে অবিচল। প্রযুক্তির জয়গানে কি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির ছায়া ঢাকা পড়বে? নাকি ভারত মণ্ডপম থেকে ওঠা নৈতিকতার এই বার্তা বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে? এর উত্তর মিলবে সামিটের সমাপ্তি অনুষ্ঠানেই।
(Feed Source: zeenews.com)
