)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মর্মান্তিক শিকার ময়মনসিংহের যুবক দীপু চন্দ্র দাস। ২০২৫-এর ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় যে নৃশংস কায়দায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, তা স্তম্ভিত করে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। সেই ঘটনার দীর্ঘ সময় পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দীপুর পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে এই সহায়তার অংশ হিসেবে সঞ্চয়পত্র হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার নির্মমতা ও প্রেক্ষাপট
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা দীপু চন্দ্র দাস ছিলেন ভালুকার ‘পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড’ কারখানার একজন সাধারণ শ্রমিক। ঘটনার দিন তথাকথিত ‘ইসলাম অবমাননার’ গুজব রটিয়ে এক উন্মত্ত জনতা তাঁকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করে। নির্মমতা এখানেই শেষ হয়নি; হত্যার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে দীপুর মরদেহ বিবস্ত্র অবস্থায় ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া এই নৃশংসতা রোধ করা সম্ভব হয়নি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
সরকারের আর্থিক সহায়তা ও উদ্যোগ
দীপু দাসের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে যায়। গত ২৩ ডিসেম্বর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার দীপুর বাড়িতে গিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে:
১. পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী একটি পাকা ঘর নির্মাণের জন্য ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে।
২. দীপুর বাবা এবং স্ত্রীকে ১০ লক্ষ টাকা করে নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে।
৩. দীপুর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ৫ লক্ষ টাকার একটি এফডিআর (সঞ্চয়পত্র) করে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার এই ঘটনাকে একটি ‘নৃশংস অপরাধ’ এবং ‘পুরো জাতির জন্য লজ্জার’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, কোনো পরিস্থিতিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারো নেই।
সংবাদ সম্মেলন ও পরিবারের আর্তি
সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে ‘বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট’-এর ব্যানারে এক সংবাদ সম্মেলন করেন দীপুর স্বজনরা। সেখানে দীপুর মা শেফালী রানী দাস এবং বাবা রবি লাল চন্দ্র দাস সরকারের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানালেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
শেফালী রানী দাস বলেন, ‘টাকা পেলেও অপরাধীরা সবাই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। আমি আমার ছেলে হত্যার কঠিন বিচার চাই এবং বউমার জন্য একটি সরকারি চাকরির আবেদন করছি।’ দীপুর স্ত্রী মেঘনা রবিদাস কেবল তাঁর স্বামী হত্যার ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন।
সনাতনী জাগরণ জোটের প্রতিক্রিয়া
সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের সহ-মুখপাত্র কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, ‘অতীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হত্যার পর পরিবারকে এভাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তার নজির আমরা দেখিনি। এই উদ্যোগের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।’ তবে জোটের প্রতিনিধি সুমন রায় অভিযোগ করেন, একই সময়ে হত্যার শিকার অন্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্র যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, দীপুর ক্ষেত্রে প্রথমদিকে সেই নজরের অভাব ছিল।
তদন্ত ও বিচারের বর্তমান অবস্থা
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে। সরকার এই মামলাটির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাবে তদন্ত ভিন্নখাতে না যায়।
দীপু দাসের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান সরকারের একটি ইতিবাচক ও মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল অর্থ দিয়ে একটি জীবনের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার বলি হওয়া দীপু দাসের পরিবার তখনই প্রকৃত শান্তি পাবে, যখন খুনিদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, এই বিচার প্রক্রিয়া একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রাণ এভাবে ঝরে না যায়।
(Feed Source: zeenews.com)
