)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার পরই অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এক নতুন এবং অত্যন্ত ভয়াবহ ‘নীরব মহামারী’ (Silent Pandemic) নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছেন এমন কিছু সংক্রমণের কারণে, যেগুলোর ওপর প্রচলিত কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ বা এএমআর (AMR)।
এএমআর (AMR) কী?
সাধারণত শরীরে কোনও ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক সংক্রমণ হলে চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিয়ে থাকেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জীবাণুগুলোও নিজেদের গঠন পরিবর্তন করে ফেলে এবং ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এর ফলে এক সময় প্রচলিত ওষুধগুলো সেই জীবাণুকে মারতে ব্যর্থ হয়। একেই বলা হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। যখন কোনও ব্যাকটেরিয়া প্রায় সব ধরণের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন তাকে ‘সুপারবাগ’ বলা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি
অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রতি বছর প্রায় ৫,০০০-এর বেশি মানুষ সরাসরি এই সুপারবাগের সংক্রমণে মারা যাচ্ছেন। এটি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ১০০ জনের কাছাকাছি। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, চিকিৎসকরা সাধারণ অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা বা সামান্য আঘাতের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের ভয় পাচ্ছেন। কারণ, যদি একবার ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছেও একে থামানোর মতো কোনো পথ থাকছে না।
কেন এই মহামারী ‘নীরব’?
করোনা মহামারীর মতো এই রোগটি হঠাৎ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে না। এটি খুব ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে। একজন ব্যক্তি যখন হাসপাতালে ভর্তি হন বা সাধারণ কোনও রোগে আক্রান্ত হন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না যে, তাঁর শরীরে থাকা জীবাণুটি ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। যখন কোনও সাধারণ সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, তখনই এর ভয়াবহতা বোঝা যায়। আর এই কারণেই একে ‘সাইলেন্ট প্যানডেমিক’ বা নীরব মহামারী বলা হচ্ছে।
এই সংকটের প্রধান কারণসমূহ
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য মূলত তিনটি বিষয়কে দায়ী করছেন:
১. অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: সামান্য সর্দি-কাশি বা সাধারণ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও মানুষ অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ফেলেন। এতে শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো ওষুধের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
২. কৃষি ও গবাদি পশু পালন: অনেক সময় পশুখাদ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো হয়, যা পরোক্ষভাবে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে এবং রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে।
৩. নতুন ওষুধের অভাব: গত কয়েক দশকে বাজারে খুব কম নতুন ধরণের অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে। ফলে পুরনো ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে জীবাণুরা সহজেই জয়ী হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রভাব
অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে এই মৃত্যুর হার কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আধুনিক চিকিৎসায় হাঁটু প্রতিস্থাপন, সিজারিয়ান ডেলিভারি বা কেমোথেরাপির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। কারণ এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই শরীর সংক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং তখন যদি অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করে, তবে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
উত্তরণের উপায় ও সমাধান
অস্ট্রেলিয়ার সরকার এবং স্বাস্থ্য বিভাগ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা ভাবছে:
সচেতনতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষকে বোঝানো যে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো জাদুর ওষুধ নয় এবং এটি ভাইরাসের ওপর কাজ করে না।
চিকিৎসকদের কঠোরতা: চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে খুব প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব না করা হয়।
গবেষণায় বিনিয়োগ: নতুন ধরণের শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের জন্য গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: হাসপাতালগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা।
অস্ট্রেলিয়ার এই সংকট আসলে পুরো বিশ্বের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে, যেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কেনার চল রয়েছে, সেখানে এই বিপদ আরও বেশি হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার এই ‘সাইলেন্ট প্যানডেমিক’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা যদি এখন থেকেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে সতর্ক না হই, তবে আগামী দিনে সাধারণ একটা ক্ষত থেকেও প্রাণহানির সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার মাঝে এই জীবাণুদের জয় সত্যিই মানবজাতির জন্য এক অশনি সংকেত।
(Feed Source: zeenews.com)
