)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইলাহাবাদ হাইকোর্টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী রায়। আইনি ও সামাজিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। লিভ-ইন রিলেশনশিপ বা সহবাসের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার রক্ষায় এই রায় এক নতুন দিশা দেখিয়েছে। লিভ-ইন সঙ্গিনীও পাবেন খোরপোশ, ইলাহাবাদ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়, দায় এড়াতে পারবেন না পুরুষরা।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একত্রে বসবাস করলে, বিচ্ছেদের পর ওই নারী তাঁর সঙ্গীর কাছ থেকে খোরপোশ বা ভরণপোষণ (Maintenance) পাওয়ার আইনত অধিকারী।
বিবাহের আইনি শংসাপত্র নেই— কেবল এই অজুহাতে দীর্ঘদিনের লিভ-ইন সঙ্গিনীকে মাঝপথে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে যেতে পারবেন না কোনও পুরুষ। লিভ-ইন রিলেশনশিপে থাকা নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার সুনিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী রায় দিল ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত সাফ জানিয়েছে, যদি কোনো পুরুষ ও নারী দীর্ঘ সময় ধরে স্বামী-স্ত্রীর মতো একত্রে বসবাস করেন, তবে বিচ্ছেদের পর ওই নারী খোরপোশ পাওয়ার যোগ্য। এক্ষেত্রে বিয়ের আনুষ্ঠানিক আইনি প্রমাণের অনুপস্থিতি কোনো বাধা হতে পারে না।
মামলার প্রেক্ষাপট: মুরাদাবাদের সেই ঘটনা
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত উত্তরপ্রদেশের মুরাদাবাদ জেলা থেকে। সেখানকার জনৈক এক মহিলা জনৈক ‘লোকো পাইলট’-এর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে লিভ-ইন রিলেশনশিপে ছিলেন। তাঁরা সমাজ ও পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়েই বসবাস করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পর ওই মহিলা তাঁর জীবনধারণের জন্য ভরণপোষণের দাবি জানিয়ে মুরাদাবাদের নিম্ন আদালতের দ্বারস্থ হন।
নিম্ন আদালত সমস্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে নির্দেশ দেয় যে, ওই রেলকর্মী বা লোকো পাইলটকে তাঁর প্রাক্তন লিভ-ইন সঙ্গিনীকে নিয়মিত খোরপোশ দিতে হবে। কিন্তু নিম্ন আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেন ওই ব্যক্তি। তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু তাঁদের মধ্যে কোনো প্রথাগত বা আইনি বিবাহ সম্পন্ন হয়নি, তাই তিনি খোরপোশ দিতে বাধ্য নন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কড়া বার্তা
মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের জাস্টিস মদন পাল সিং এবং জাস্টিস মুনিশ কুমার-এর ডিভিশন বেঞ্চে। শুনানি চলাকালীন আদালত ওই ব্যক্তির যুক্তি খারিজ করে দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে:
১. প্রযুক্তিগত ত্রুটির দোহাই চলবে না: আদালত বলে, লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ‘টেকনিক্যাল’ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির দোহাই দিয়ে পুরুষরা তাঁদের দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন না।
২. বিবাহের আনুষ্ঠানিক প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা: বেঞ্চ স্পষ্ট করে দেয় যে, খোরপোশ বা ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য সবসময় বিয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক বা আইনি দলিলের প্রয়োজন হয় না। যদি দীর্ঘ সময় ধরে দুজনে একই ছাদের নিচে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করেন, তবে আইনগতভাবে তাঁদের বিবাহিত দম্পতির মতোই গণ্য করা হবে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের নজির: ইলাহাবাদ হাইকোর্ট এই রায় দেওয়ার সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী একটি নির্দেশের কথা উল্লেখ করেছে। সেখানেও বলা হয়েছিল যে, দীর্ঘকালীন সহবাসকে সমাজ ও আইন ‘বিবাহ’ হিসেবেই দেখে এবং তার ফলে তৈরি হওয়া দায়বদ্ধতা এড়ানো যায় না।
লোকো পাইলটের আবেদন খারিজ
আদালত লক্ষ্য করেছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি রেলের একজন লোকো পাইলট হিসেবে কর্মরত এবং তাঁর আর্থিক সচ্ছলতা রয়েছে। অন্যদিকে, ওই নারী তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার পর এখন একা ও নিঃস্ব। এমতাবস্থায় কেবল ‘বিয়ে হয়নি’ এই তকমা দিয়ে তাঁকে পথে বসানো যায় না। ডিভিশন বেঞ্চ লোকো পাইলটের করা রিট পিটিশনটি সরাসরি খারিজ করে দেয় এবং নিম্ন আদালতের দেওয়া খোরপোশের নির্দেশ বহাল রাখে।
রায়ের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভারতের লিভ-ইন রিলেশনশিপের আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করল। বিশেষ করে যে মহিলারা দীর্ঘ সম্পর্কের পর প্রতারিত হন বা যাঁদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা থাকে না, তাঁদের জন্য এই রায় একটি বড় রক্ষাকবচ।
নারীর সুরক্ষা: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষরা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বা দীর্ঘকাল একসাথে থেকে পরে দায় ঝেড়ে ফেলেন। এই রায়ের ফলে তেমনটা করা কঠিন হবে।
স্বচ্ছতা: আদালত পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, সামাজিক পরিচিতিই এখানে বড় প্রমাণ। যদি প্রতিবেশীরা তাঁদের দম্পতি হিসেবে চেনে, তবে সেটাই আইনি প্রমাণের সমতুল্য হতে পারে।
ইলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিয়েছে। লিভ-ইন রিলেশনশিপকে শুধুমাত্র একটি সাময়িক চুক্তি হিসেবে না দেখে, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানবিক ও আর্থিক দিকগুলোকেও আইনি স্বীকৃতি দিল আদালত। বিচারক মদন পাল সিং ও বিচারক মুনিশ কুমারের এই নির্দেশ আগামী দিনে দেশজুড়ে এই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে নজির হিসেবে কাজ করবে।
(Feed Source: zeenews.com)
