জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চরম উত্তেজনার আবহ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে VDO. একটি চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে— ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কি আর বেঁচে নেই? এই জল্পনার মূলে রয়েছে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক একটি ভিডিয়ো বার্তা, যেখানে তাঁর হাতে ‘ছ’টি আঙুল’ দেখা গিয়েছে। ভিডিয়োটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দিয়ে তৈরি এবং আসল নেতানিয়াহু জনসমক্ষে নেই— এমন তত্ত্বে সরগরম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।


বিতর্কের সূত্রপাত: ভিডিয়োতে ‘ছয়টি আঙুল’
সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে ইরান ও তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সাফল্যের খতিয়ান দিচ্ছিলেন নেতানিয়াহু। কিন্তু ভিডিওটি প্রকাশ হতেই নজর কাড়ে একটি বিশেষ দৃশ্য। ভিডিওর এক জায়গায় কথা বলার সময় তিনি যখন হাত নাড়ছিলেন, তখন স্থির চিত্রে তাঁর ডান হাতে পাঁচটি নয়, বরং ছয়টি আঙুল দেখা যাচ্ছে বলে অনেকে দাবি করেন।
ডিজিটাল যুগে সাধারণত কোনো ভিডিওতে মানুষের শারীরিক কাঠামোর এমন অসামঞ্জস্যতাকে ‘এআই গ্লিচ’ (AI Glitch) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল হিসেবে ধরা হয়। জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি অনেক সময় মানুষের হাত বা আঙুল নিখুঁতভাবে তৈরি করতে পারে না। ফলে নেটিজেনদের প্রশ্ন— ‘বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম), আপনি কি এতটাই বিশেষ যে আপনার ছয়টি আঙুল? নাকি আপনি অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন আর সরকার এআই ব্যবহার করে আপনাকে জীবিত দেখাচ্ছে?’
নেতানিয়াহুর মৃত্যুসংবাদ ও ইরানের ভূমিকা
এই ভিডিয়োটি ঘিরে জল্পনা আরও ঘনীভূত হয় যখন ইরানি সংবাদমাধ্যম ও কিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল থেকে দাবি করা হয় যে, সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় নেতানিয়াহু আহত বা নিহত হয়েছেন। এক ব্যবহারকারী দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে একটি শোকবার্তা পোস্ট করে ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো এবং গ্রোক (Grok) এআই জানিয়েছে, এমন কোনো পোস্টের অস্তিত্বই নেই।
স্কট বেসেন্টের ‘অস্বাভাবিক’ প্রতিক্রিয়া
এই গুজবের আগুনে ঘি ঢেলেছে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের একটি সাম্প্রতিক ভিডিয়ো। একটি প্রেস কনফারেন্স চলাকালীন তিনি হঠাৎ একটি ফোন কল পেয়ে চলে যান এবং ফিরে আসার পর তাঁকে শারীরিকভাবে কাঁপতে দেখা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোহানেস এম কোয়েনরাড মন্তব্য করেন, ‘নেতানিয়াহু মারা গিয়েছেন! বেসেন্টের শরীরের ভাষা এবং কম্পিত কণ্ঠস্বর থেকে আমি এটাই বুঝতে পারছি।’ যদিও বেসেন্ট বা মার্কিন প্রশাসনের তরফে এই জল্পনার কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
আসল সত্যিটা কী?
তথ্য যাচাইকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (যেমন টাইমস অফ ইসরায়েল, স্নোপস এবং পলিটিফ্যাক্ট) এই দাবিগুলোকে ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
দৃষ্টিবিভ্রম (Optical Illusion): ভিডিয়োর যে ফ্রেমটি ভাইরাল হয়েছে, তা নিছকই ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এবং আলোর কারসাজি। হাত নাড়ানোর সময় কড়ে আঙুলের পাশের মাংসল অংশটি ইমেজের ব্লার বা অস্পষ্টতার কারণে বাড়তি আঙুল বলে মনে হচ্ছে। পুরো ভিডিওটি মন দিয়ে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তাঁর হাতে পাঁচটি আঙুলই রয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য: নেতানিয়াহু গত ১২ মার্চও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। কোনও এআই ভিডিয়োতে রিয়েল-টাইমে এমন প্রশ্নোত্তর পর্ব চালানো সম্ভব নয়।
ভুয়ো ছবি: এর পাশাপাশি নেতানিয়াহুর রক্তাক্ত অবস্থার কিছু ছবিও ছড়িয়েছিল, যা ফরেনসিক পরীক্ষায় এআই দ্বারা জেনারেট করা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ময়দান যতটা উত্তপ্ত, তার চেয়েও বেশি তীব্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন এক বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যু বা ‘ছয় আঙুল’ সংক্রান্ত জল্পনাগুলি আসলে ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া সুপরিকল্পিত গুজব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং দেশ পরিচালনার কাজ সক্রিয়ভাবে সামলাচ্ছেন।
(Feed Sourc: zeenews.com)
