জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল এবং সাংস্কৃতিক ময়দানেও। সম্প্রতি সম্প্রতি একটি’অ্যানিমেশন-স্টাইল’ ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলেছে। এই ভিডিওটিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইনিকে এক অপরাজেয় যোদ্ধারূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনার মাঝে এই ভিডিওটি কেবল বিনোদন নয়, বরং ইরানের একটি শক্তিশালী ‘সফট পাওয়ার’ প্রোপাগান্ডা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অ্যানিমেশনে যুদ্ধ
ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে দেখা যায়, একটি কাল্পনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট যেখানে আকাশ জুড়ে ড্রোন এবং মিসাইল ধেয়ে আসছে। জাপানিজ় অ্যানিমেশন স্টাইলে নির্মিত ওই ভিডিয়োতে খামেইনিকে অত্যন্ত ধীরস্থির কিন্তু শক্তিশালী এক রাষ্ট্রনেতার ভূমিকায় দেখানো হয়েছে। ভিডিয়োটির গ্রাফিক্স এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এতটাই ভালো যে, প্রথমবার দেখলে কোনও বড় বাজেটের সিরিজের ট্রেলার বলে মনে হতে পারে।
ভিডিয়োটিতে প্রতীকীভাবে দেখানো হয়েছে যে, কী ভাবে ইরান তার শত্রুদের (প্রধানত ইসরায়েল ও আমেরিকা) আক্রমণ প্রতিহত করছে এবং পালটা আঘাত হানছে। ড্রোন আক্রমণের নিখুঁত দৃশ্য এবং আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে খামেইনিইর উপস্থিতি ইরানের তরুণ প্রজন্মের জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়ার একটি কৌশল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন এই ভিডিয়ো এখন ভাইরাল?
এই অ্যানিমেশন ভিডিয়োটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের হুমকি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চাপের মুখে ইরান তার অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখতে চাইছে।
১. তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা: ইরানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। প্রথাগত ভাষণের চেয়ে অ্যানিমেশন বা পপ-কালচারের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো অনেক বেশি কার্যকর।
২. মনস্তাত্ত্বিক লড়াই: শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে এবং নিজেদের সামরিক সামর্থ্যের এক কাল্পনিক আধিপত্য প্রদর্শন করতে এই ধরনের ভিডিও তৈরি করা হয়।
৩. আয়াতুল্লাহর প্রত্যাবর্তন: ভিডিয়োটির টাইটেল বা বার্তা হিসেবে ‘খামেনেই ইজ ব্যাক’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ওঠা গুঞ্জনকে নাকচ করে তাঁর সক্রিয় নেতৃত্বকে তুলে ধরে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
ভিডিয়োটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক্স (সাবেক টুইটার) এবং টেলিগ্রামে ইরানের সমর্থকরা একে “ইসলামিক প্রতিরোধের নতুন রূপ” বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে এটি একটি “বিপজ্জনক প্রোপাগান্ডা” যা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে রোমান্টিক করে তুলছে। অনেক পশ্চিমা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মনে করেন, এটি রাশিয়ার ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ কৌশলের একটি ইরানি সংস্করণ।
সফট পাওয়ার এবং প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ
অ্যানিমেশন VDO সাধারণত জাপানি সংস্কৃতির অংশ হলেও, ইরান এখন এটিকে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগেও ইরান ড্রোনের সক্ষমতা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছে, কিন্তু এবারের ‘অ্যানিমে’ স্টাইলটি সম্পূর্ণ নতুন এবং আধুনিক। এটি প্রমাণ করে যে, ইরান তাদের প্রচারণার ধরনে আমূল পরিবর্তন আনছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
ভিডিয়োটি সরাসরি কোনও দেশের নাম উল্লেখ না করলেও, সেখানে ব্যবহৃত বিমানের ধরন এবং ধ্বংস হওয়া কাঠামো- পশ্চিমী শক্তির দিকেই ইঙ্গিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিডিয়োর মাধ্যমে ইরান বলতে চাইছে যে তারা কেবল আধুনিক প্রযুক্তিতেই (ড্রোন ও মিসাইল) দক্ষ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তাদের আদর্শিক বার্তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো সাংস্কৃতিক শক্তিও তাদের রয়েছে।
ইরানের এই অ্যানিমেশন প্রোপাগান্ডা ভিডিয়ো আসলে ভবিষ্যতের যুদ্ধের একটি মহড়া। এটি প্রমাণ করে যে যুদ্ধ এখন কেবল গোলাবারুদের নয়, বরং ন্যারেটিভ বা বর্ণনারও। খামেইনিকে এক বীর যোদ্ধারূপে তুলে ধরার মাধ্যমে ইরান তাদের অনুসারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা সময় বলবে। আপাতত ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এই ‘অ্যানিমেশন যুদ্ধ’ বড় খবর।
(Feed Source: zeenews.com)
