)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত অর্থ কী ভাবে বিনিয়োগ করবেন, তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় বই ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’-এর লেখক রবার্ট কিয়োসাকি আবারও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আমরা বর্তমানে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘মার্কেট বাবল’ বা বাজার সম্পর্কে যে ভুল বদ্ধমূল ধারণার মধ্যে রয়েছি এবং এই বুদবুদ যখন ফাটবে, তখন তা সম্পদ ব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেবে। তবে এই বিপর্যয়ের পরেই সোনা, রুপো এবং বিটকয়েনের মতো সম্পদের দাম আকাশচুম্বী হবে বলে তিনি দাবি করেছেন।
আসন্ন অর্থনৈতিক মহাধস
কিয়োসাকি দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন ডলার এবং ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতির কড়া সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন যে, শেয়ার বাজার, বন্ড এবং রিয়েল এস্টেট—সবক্ষেত্রেই এখন একটি কৃত্রিম ফোলাভাব বা বুদবুদ তৈরি হয়েছে। তিনি একে ‘এভরিথিং বাবল’ (Everything Bubble) হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিয়োসাকির মতে, এই বুদবুদ বিস্ফোরণ হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, যা ১৯২৯ সালের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহমন্দাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণ এবং লাগামহীনভাবে ডলার ছাপানোর প্রক্রিয়া এই পতনের মূল কারণ হবে। যখন সাধারণ মানুষের কাগজের মুদ্রার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাবে, তখন প্রকৃত সম্পদের (Hard Assets) গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সোনা ও রুপোর অবিশ্বাস্য লক্ষ্যমাত্রা
কিয়োসাকির ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী, বাজার পতনের ঠিক এক বছরের মধ্যে বহুমূল্য ধাতুর দামে এক অভাবনীয় উত্থান দেখা দেবে।
সোনা (Gold): বর্তমানে সোনার দাম যেখানে প্রতি আউন্স ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ ডলারের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে, কিয়োসাকি মনে করেন এটি ৩৫,০০০ ডলারে পৌঁছাবে।
রুপো (Silver): রুপোর ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক। তাঁর মতে, রুপোর দাম প্রতি আউন্স ২০০ ডলারে স্পর্শ করবে।
তিনি সোনা ও রুপোকে ‘ঈশ্বরের অর্থ’ (God’s Money) বলে অভিহিত করেন কারণ এগুলি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয় এবং হাজার বছর ধরে এগুলোর মূল্য বজায় রয়েছে।
বিটকয়েন: ডিজিটাল স্বর্ণের জয়জয়কার
ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশেষ করে বিটকয়েনের একজন কট্টর সমর্থক হিসেবে কিয়োসাকি এবারও চমকপ্রদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক ধসের পরবর্তী পর্যায়ে একটি বিটকয়েনের দাম ৭,৫০,০০০ ডলারে (প্রায় ৭.৫ লাখ ডলার) পৌঁছাবে।
বিটকয়েনকে তিনি ‘জনগণের অর্থ’ (People’s Money) বলে মনে করেন। তাঁর যুক্তি হলো, বিটকয়েনের সরবরাহ সীমিত (২১ মিলিয়ন) এবং এটি কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে মুদ্রাস্ফীতির সময় এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্যতম সেরা সুরক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া ইথিরিয়ামের দামও ৯৫,০০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ: এখনই সময়, কিনে নিন
কিয়োসাকি কেবল সতর্কবার্তা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাঁর অনুসারীদের এখনই ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত দর্শন হলো– ‘বিনিয়োগে লাভ হয় যখন আপনি কেনেন, যখন বিক্রি করেন তখন নয়।’ তিনি মনে করেন, এই ধস যখন শুরু হবে তখন সোনা, রুপো এবং বিটকয়েনের দাম সাময়িকভাবে কমতে পারে। সেই সময়কেই তিনি শ্রেষ্ঠ ‘ক্রয় সুযোগ’ (Buying Opportunity) হিসেবে দেখছেন।
কিয়োসাকির পরামর্শ :
১. ফিয়াট কারেন্সি ত্যাগ করুন: ডলার বা ইউরোর মতো কাগজের মুদ্রাকে তিনি ‘ভুয়া টাকা’ হিসেবে দেখেন।
২. প্রকৃত সম্পদ সঞ্চয় করুন: সোনা, রুপো এবং বিটকয়েন নিজের পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
৩. শিক্ষিত হোন: বাজারের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে আর্থিক শিক্ষা অর্জনের কথা বলেছেন।
বাস্তব ভিত্তি
রবার্ট কিয়োসাকির এই ভবিষ্যৎবাণীগুলি অনেক সময় বিতর্কিত বা অতিরিক্ত নাটকীয় মনে হতে পারে। সমালোচকদের মতে, তিনি বহু বছর ধরেই একই ধরনের ধসের কথা বলে আসছেন যা সবসময় সফল হয়নি। তবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা এবং মুদ্রাস্ফীতির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তাঁর এই সতর্কতা অনেক বিনিয়োগকারীকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
কিয়োসাকির মূল বার্তাটি স্পষ্ট— প্রথাগত আর্থিক ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়বে, তখন কেবল তারাই টিকে থাকবে যাদের কাছে সোনা, রুপো বা বিটকয়েনের মতো বাস্তব ও বিকেন্দ্রীভূত সম্পদ থাকবে। তাঁর মতে, প্রশ্নটি ‘যদি’ (If) নয় বরং ‘কখন’ (When)-এর।
(Feed Source: zeenews.com)
