
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ২০২৬-এ মার্কিন রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ২০২৪ সালের দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সারা পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে চলতে গিয়েই, এক নজিরবিহীন জনপ্রিয়তার সংকটে পড়েছেন।
সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অনমনীয় আচরণ– আমেরিকার সাধারণ ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন আনছে।
জনমত সমীক্ষায় উদ্বেগজনক ফল
‘AL.com’ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন খুব খারাপ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ভোটারদের একটি বড় অংশ জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর পরিকল্পনা তারা সমর্থন করছেন না।
ব্যাক্তিগত রেটিং: ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুমোদন রেটিং (Approval Rating) গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের বিরোধিতা: প্রায় ৬৫% ভোটার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তারা ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনৈতিক সমাধানকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
ইরান ইস্যু ও ট্রাম্পের অবস্থান
২০২৬ সালের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চূড়ান্ত আকার নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাম্প প্রশাসন (বা তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব) ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর যুদ্ধ ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করে আসছিল।
ট্রাম্পের দাবি ছিল, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ইরানকে দমন করা অপরিহার্য। তবে আমেরিকান জনগণ, যারা ইতিমধ্যে আফগানিস্তান এবং ইরাক যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখেছে, তারা আর কোনও নতুন ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।
ভোটারদের পিছু হঠার কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এই ধসের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
১. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমেরিকার অভ্যন্তরে মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। তারা মনে করছেন, যুদ্ধ মানেই ট্যাক্সের টাকার অপচয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
২. যুদ্ধক্লান্ত দেশবাসী: দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলে আসা ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ (Endless Wars) থেকে আমেরিকানরা মুক্তি চায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং মধ্যবিত্তর মনে করে, ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহি মনোভাব দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নতির বদলে ধ্বংসাত্মক পথে নিয়ে যাচ্ছে।
৩. বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজ: সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, রিপাবলিকান পার্টির ভিতরেও একটি বড় অংশ এখন ট্রাম্পের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। যারা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি পছন্দ করতেন, তারাও এখন মনে করছেন যে যুদ্ধের উস্কানি সেই নীতির পরিপন্থী।
রিপাবলিকান শিবিরের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এই ফাটল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে কম্পন সৃষ্টি করেছে। আলাবামা বা ফ্লোরিডার মতো তথাকথিত ‘রেড স্টেট’গুলোতেও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। অনেক দলীয় নেতা এখন প্রকাশ্যে ট্রাম্পের ইরান নীতির সমালোচনা করছেন না ঠিকই, কিন্তু গোপনে তারা ২০২৬-এর অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ নিয়ে চিন্তিত।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা যুক্তি
জনপ্রিয়তা কমলেও ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড়। তিনি তাঁর সাম্প্রতিক জনসভাগুলোতে দাবি করেছেন যে, “দুর্বল নেতৃত্ব” ইরানকে শক্তিশালী করছে এবং কেবল তাঁর কঠোর পদক্ষেপই আমেরিকাকে নিরাপদ রাখতে পারে। তবে তাঁর এই বাগাড়ম্বর এখন আর আগের মতো ভোটারদের টানছে না বলে জরিপের তথ্যে পরিষ্কার।
আন্তর্জাতিক প্রভাব
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ এই জনমত সরাসরি বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মিত্র দেশগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, আমেরিকার জনমত যদি যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকে, তবে ট্রাম্প বা মার্কিন সরকার কতটা সামরিক সহায়তা দিতে পারবে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের এই সময়টি ট্রাম্পের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। যদি তিনি তাঁর যুদ্ধংদেহি অবস্থান পরিবর্তন না করেন, তবে রিপাবলিকান পার্টির ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ আলগা হতে পারে। ভোটারদের এই প্রত্যাখ্যান কেবল একটি পলিসির বিরোধিতা নয়, বরং এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের ওপর এক বিশাল আঘাত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় জনমতকে নিজের পক্ষে ঘোরাতে ওস্তাদ ছিলেন, কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা সেই জাদুকে ম্লান করে দিয়েছে। আমেরিকানরা এখন শান্তির পক্ষে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে কথা বলছে। আগামী কয়েক মাস নির্ধারণ করবে ট্রাম্প এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবেন নাকি তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সূর্য অস্তমিত হতে শুরু করবে।
(Feed Source: zeenews.com)
