জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর আঁচ এসে পড়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাজপথের যানবাহনে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল, ২০২৬) টানা ৩৩ দিনে পদার্পণ করেছে। এই ৩৩ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রায় স্থবির করে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি এক ভয়াবহ অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে।
বিশ্বের প্রথম ‘তেলশূন্য’ দেশ বাংলাদেশ?
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ইনডিপেনডেন্ট’-এর এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, চলমান এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রথম জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া দেশ হতে পারে বাংলাদেশ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটিতে জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে।
যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেবল বৃদ্ধিই পায়নি, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় এশিয়ায় তেল আসার প্রধান পথটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উল্লেখ্য, এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
রাজধানীর রাজপথে হাহাকার:
সরকারিভাবে সংকটের কথা অস্বীকার করা হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক মোটরসাইকেল চালক ও পরিবহনকর্মী সামান্য পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না।
অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনে। যানজটের শহর ঢাকায় এখন যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা ও পণ্য পরিবহন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
মজুত পরিস্থিতি
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড বলা হয় চট্টগ্রামের ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’-কে। কিন্তু বর্তমানে এই শোধনাগারে অপরিশোধিত তেলের যে মজুত রয়েছে, তা দিয়ে বড়জোড় আর দুই সপ্তাহ চাহিদা মেটানো সম্ভব। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল ডিজেল ও অকটেনের মজুত।
মার্চের শুরুর দিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাত্র ৯ দিনের ডিজেল মজুত ছিল। বর্তমান অস্থিরতায় এই মজুত আরও দ্রুত কমে আসছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন কোনো তেলের জাহাজ বন্দরে না পৌঁছায়, তবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি ও শিল্পকারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সরকারের রেশনিং পরিকল্পনা ও কঠোর পদক্ষেপ:
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে:
জ্বালানি রেশনিং: ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য তেল বিক্রিতে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হতে পারে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়: আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা এবং রাত নামার সাথে সাথে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: লোডশেডিং ও যাতায়াত খরচ কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বা অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় সরকার কিছুটা নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করলেও, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎসবের আনন্দ ম্লান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া বাংলাদেশ:
সনাতন উৎস থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার এখন বিকল্প দেশগুলোর দিকে হাত বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং আজারবাইজান থেকে জরুরি ভিত্তিতে তেল আমদানির চেষ্টা চলছে।
এমনকি রাশিয়ার ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সেখান থেকে ডিজেল আমদানির জন্য বিশেষ অনুমতির আবেদন জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। তবে বিশ্বজুড়ে তেলের তীব্র চাহিদার কারণে এই দেশগুলো থেকে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দাবি করা হলেও পাম্পের দীর্ঘ লাইন এবং মজুতের স্বল্পতা সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে পারে। এখন সময়ের দাবি হলো—কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিপর্যয় মোকাবিলা করা। অন্যথায়, ‘তেলশূন্য’ দেশ হওয়ার তকমাটি বাংলাদেশের জন্য এক বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেবে।
(Feed Source: zeenews.com)
