জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: গণতন্ত্রের উৎসবে কত বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে! তবে তামিলনাড়ুর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যা ঘটল, তা সম্ভবত সব আলোচনাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। খুনের মামলা থেকে শুরু করে একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি জেলবন্দি অবস্থাতেই নির্বাচনের মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল তাঁর বিশাল সম্পত্তির পরিমাণ। হলফনামায় তিনি ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর কাছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা মূল্যের সোনার অলঙ্কার ও সম্পদ রয়েছে। এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কারাগার থেকেই লড়াই:
তামিলনাড়ুর নির্বাচনী ইতিহাসে অপরাধীদের অংশগ্রহণ নতুন নয়, তবে এবারের ঘটনাটি অনন্য। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি পুলিশের তালিকায় একজন ‘হিস্ট্রি-শিটার’ বা দুর্ধর্ষ অপরাধী হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তিনি একটি বড় অপরাধের মামলায় জেল হেফাজতে রয়েছেন।
আইনি জটিলতা থাকলেও, সাজা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংবিধানিক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি কারাগারের ভেতর থেকেই মনোনয়ন দাখিল করেছেন। তাঁর হয়ে তাঁর সমর্থক এবং আইনজীবীরা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে সমস্ত নথিপত্র জমা দেন।
হলফনামায় সম্পত্তির পাহাড়:
নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, ওই প্রার্থীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দেখে চোখ কপালে উঠেছে খোদ আধিকারিকদেরও। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে:
স্বর্ণালঙ্কার: প্রার্থীর কাছে কয়েক কেজি ওজনের সোনার গয়না ও বার রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা।
নগদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স: সোনা ছাড়াও তাঁর এবং তাঁর পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও ব্যাংক আমানত রয়েছে।
স্থাবর সম্পত্তি: হলফনামায় একাধিক জমি, বাণিজ্যিক ভবন এবং বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের উল্লেখ রয়েছে, যা মূলত চেন্নাই এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে অবস্থিত।
অপরাধের খতিয়ান বনাম জনসমর্থন:
পুলিস রেকর্ড অনুযায়ী, এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, অপহরণ এবং খুনের চেষ্টার মতো ডজনখানেক মামলা রয়েছে। তা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট এলাকায় তাঁর ‘রবিনহুড’ ইমেজের কারণে এক বিশাল অনুসারী বাহিনী রয়েছে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন কারাগারের বাইরে তাঁর সমর্থকরা উল্লাস প্রদর্শন করেন।
তাদের দাবি, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই তিনি আজ জেলবন্দি। তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—একজন দাগী অপরাধী কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণসম্পদ অর্জন করলেন?
এই ঘটনাটি সামনে আসার পর বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। যদিও কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনও ব্যক্তি উচ্চ আদালত কর্তৃক দুই বছর বা তার বেশি মেয়াদের সাজাপ্রাপ্ত না হন, তবে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করার সরাসরি কোনো উপায় নেই।
তবে কমিশন নিশ্চিত করেছে যে, হলফনামায় দেওয়া সম্পত্তির তথ্য এবং প্রার্থীর অপরাধমূলক রেকর্ডের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। যদি তথ্যে কোনো গরমিল পাওয়া যায়, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক:
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এই ঘটনাটি নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে শাসক দল এবং অন্যদিকে প্রধান বিরোধী পক্ষ—উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, রাজনীতিতে অপরাধীদের এই বাড়বাড়ন্ত এবং বিশাল অর্থের প্রদর্শন সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আস্থার মূলে কুঠারাঘাত করছে।
১৭ কোটি টাকার সোনা থাকার বিষয়টি আয়কর বিভাগের নজরেও এসেছে এবং তারা এই আয়ের উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
জেলখানা থেকে নির্বাচন লড়া এবং কোটি কোটি টাকার সোনা প্রদর্শন—এই দুই মিলিয়ে তামিলনাড়ুর এই আসনটি এখন গোটা দেশের নজর কেড়েছে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা একজন অপরাধমূলক রেকর্ডধারী এবং বিপুল বিত্তের মালিককে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেন কি না, না কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দেন, তা সময় বলবে। তবে এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, ভারতীয় রাজনীতিতে ‘মাসল পাওয়ার’ (পেশীশক্তি) এবং ‘মানি পাওয়ার’ (অর্থশক্তি) এখনও কতটা প্রভাবশালী।
(Feed Source: zeenews.com)
