)
রাজীব চক্রবর্তী এবং অর্ণবাংশু নিয়োগী: ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। আর তার আগে ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং বাদ পড়া নিয়ে যে ভয়ংকর আইনি লড়াই চলছে, সোমবার সুপ্রিম কোর্টে তারই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হল। ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর (Special Intensive Revision) মামলার এই শুনানিতে ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা এবং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবই উঠে এল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে চলা এই শুনানির নির্যাস এবং আদালতের দেওয়া নির্দেশগুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল–
১. আবেদনের নিষ্পত্তি: পরিসংখ্যান ও বর্তমান অবস্থা
শুনানির শুরুতেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে একটি চিঠি এসেছে। সেই তথ্যানুযায়ী:
ক. সোমবার বেলা ১২টা পর্যন্ত মোট ৫৯ লক্ষ ১৫ হাজার ৩৯টি আবেদনের নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
খ. নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু জানান, প্রথম দফার প্রায় ২৬ হাজার এবং দ্বিতীয় দফার ২২ হাজার নামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাকি আছে, যা আজ রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
গ. বিশেষত মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় ৮ লক্ষের বেশি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে, যা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সম্ভব হয়েছে বলে আদালত সন্তোষ প্রকাশ করে।
২. ট্রাইব্যুনাল গঠন ও নতুন উচ্চপর্যায়ের কমিটি
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে ভোটাররা যেখানে আপিল করবেন, সেই অ্যাপেলট ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বড় নির্দেশ দিয়েছে:
হাইকোর্ট কমিটি: কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হয়েছে, তিনি যেন ৩ জন প্রাক্তন অভিজ্ঞ বিচারপতিকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেন।
SOP নির্ধারণ: এই কমিটি আগামিকালের (৭ এপ্রিল) মধ্যে একটি নির্দেশিকা বা SOP (Standard Operating Procedure) তৈরি করবে। রাজ্যের ১৯টি ট্রাইব্যুনালকেই বাধ্যতামূলকভাবে এই একই পদ্ধতি মেনে কাজ করতে হবে।
ব্যক্তিগত শুনানি: যাদের নাম বাদ গিয়েছে, ট্রাইব্যুনাল যেন তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শোনে এবং কেন নাম বাদ গেল, তার সঠিক কারণ খতিয়ে দেখে।
৩. রশিদ ও অফলাইন আবেদনের সুযোগ
শুনানিতে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, ভোটাররা অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আবেদনের কোনও রশিদ বা Acknowledgement Receipt দেওয়া হচ্ছে না। এর প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশ:
ক. অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও আবেদন করা যাবে।
খ. ভোটাররা চাইলে জেলাশাসক (DM) বা পুলিস সুপার (SP) অফিসে গিয়েও আবেদন জমা দিতে পারবেন।
গ. আবেদন জমা নেওয়া মাত্রই আধিকারিকদের বাধ্যতামূলকভাবে রসিদ বা অ্যাকনলেজমেন্ট দিতে হবে। এর তদারকির জন্য একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।
৪. সময়সীমা ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা
মামলায় অংশ নেওয়া আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান এবং কপিল সিব্বল ভোটারদের অধিকার নিয়ে সরব হন।
পরিসংখ্যান নিয়ে উদ্বেগ: শ্যাম দিওয়ান জানান, ৬০ লক্ষ মামলার মধ্যে ৪৪ লক্ষের তথ্য পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৫৫ শতাংশ নাম তালিকায় উঠেছে এবং ৪৫ শতাংশ বাতিল হয়েছে। এই বাতিল হওয়ার হার অত্যন্ত বেশি বলে তিনি দাবি করেন।
কাট-অফ ডেট: আবেদনকারীদের দাবি ছিল, ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল সব নিষ্পত্তি করুক এবং ১৮ এপ্রিল চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হোক।
ডিজিটাল সিগনেচার: আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ৭ এপ্রিলের মধ্যে পোর্টালে ডিজিটাল সিগনেচার-সহ সাপ্লিমেন্টারি তালিকা আপলোড করতে হবে।
৫. ভোটাধিকার প্রক্রিয়া
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র তালিকায় আগে নাম ছিল বলেই কাউকে সরাসরি ভোট দিতে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় না। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘আমরা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে সচেতন। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। চূড়ান্ত আদেশ পেতে ৩০ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’ তবে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের আগে যাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তারা অবশ্যই ভোট দিতে পারবেন।
৬. উত্তপ্ত সওয়াল-জবাব
শুনানিতে উঠে আসে রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়াও।
কমিশনের অভিযোগ: নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নাইডু এবং সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে অভিযোগ করেন যে, রাজ্যে উস্কানিমূলক মন্তব্য করে পরিবেশ বিষিয়ে তোলা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্যের ভিডিয়োর কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে (CRPF) নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। এক মহিলা জুডিশিয়াল অফিসারের কান্নার প্রসঙ্গও তোলা হয়।
পাল্টা দাবি: রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্ট যুক্তি দেন যে, মুখ্যমন্ত্রীকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও আদালতকে দেখার অনুরোধ জানান।
কেন্দ্রীয় বাহিনী: বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখনই কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রত্যাহার করা যাবে না।
৭. বিশেষ নির্দেশ: নন্দলাল বসুর উত্তরসূরি
একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয়ে আদালত নির্দেশ দিয়েছে। বীরভূমের শান্তিনিকেতনে বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর নাতির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে কমিশনকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। ৯ এপ্রিলের মধ্যে তাঁর আবেদনের নিষ্পত্তি করার আশ্বাস দিয়েছে কমিশন।
সুপ্রিম কোর্টের এদিনের নির্দেশ অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালগুলি যাতে আরও সক্রিয় এবং স্বচ্ছ হয়, তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিচারকরা জানিয়েছেন, প্রশাসন যদি ব্যর্থ হয়, তবে সর্বোচ্চ আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করবে।
সাধারণ মানুষের যাতে ঘর থেকে অনেক দূরে কলকাতায় এসে আপিল করতে না হয়, তার জন্য স্থানীয় স্তরে আবেদন গ্রহণের নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ১৩ এপ্রিল। ততক্ষণ পর্যন্ত নজর থাকবে নবগঠিত কমিটির গাইডলাইন এবং কমিশন প্রকাশিত সাপ্লিমেন্টারি তালিকার ওপর।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার নাম যদি ভোটার তালিকায় না থাকে, তবে আপনি স্থানীয় মহকুমা শাসক বা জেলাশাসকের দফতরে গিয়ে অফলাইনেও আবেদন করতে পারেন এবং অবশ্যই রশিদ বুঝে নিন।
(Feed Source: zeenews.com)
