
ড. আশিস মিত্র
(প্রখ্যাত এনডোক্রিনোলজিস্ট)
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বাড়ির খুদে সদস্য।
ভাবলেই কেমন ভয় ধরে যায়, তাই না? আসুন এই বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সুস্থ রাখাই আমাদের গুরু দায়িত্ব।
ডায়াবেটিস এই রোগটি উদ্বেগের নিঃসন্দেহে, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে তো বটেই। যদিও চিকিৎসকেরা বলছেন, আগেভাগে ধরা পড়লে, ঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে বাচ্চাকে ভাল রাখা ততটাও কঠিন নয়।
ছোটদের ডায়াবেটিস অর্থাৎ খাতায়-কলমে এতকাল যার পরিচয় ছিল জুভেনাইল ডায়াবেটিস হিসেবে, তা মূলত বোঝাত টাইপ ১ ডায়াবেটিসকেই। টাইপ ২ ডায়াবেটিস, অর্থাৎ বড়দের ক্ষেত্রে যে রোগ হয়, তার শিকড় থাকে জীবনযাত্রার ধরনে। এই টাইপ ১ ডায়াবেটিস তা নয়, বরং এটি এক ধরনের অটো ইমিউন ডিজিজ যাতে অগ্ন্যাশয় শরীরে ইনসুলিন তৈরিই করে না, কিংবা করলেও খুবই কম। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে জানা গিয়েছে, গোটা বিশ্বেই টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ছে। আর সেই সংখ্যায় ভারতের অবদান যথেষ্টই।
তবে বিশিষ্ট ডায়াবেটোলজিস্ট, চিকিৎসক আশিস মিত্রের মতে, ছোটদের ডায়াবেটিস মানেই টাইপ ১ ডায়াবেটিস, এমনটা ভাবলে ভুল করবেন। তাঁর কথায়, “জুভেনাইল ডায়াবেটিস কথাটা এখন আর চিকিৎসা ক্ষেত্রে সে ভাবে ব্যবহার হয় না। কারণ আগের মতো ছোটদের ডায়াবেটিস মানেই শুধু টাইপ ১ ডায়াবেটিস, এ বিষয়টায় তা আর সীমাবদ্ধ নেই। বরং জুভেনাইল ডায়াবেটিসের অধীনে নানা ধরনের ডায়াবেটিস-জনিত রোগই পড়ে, যা ছোটদের হতে পারে।”
তা হলে ছোটদের মধ্যে কী কী ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যেতে পারে?
চিকিৎসক মিত্রের মতে, “বাচ্চাদের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্রথমেই বলা উচিত নিওনেটাল ডায়াবেটিসের কথা। এই রোগটা একেবারে ছোটদের অর্থাৎ এক-দেড় বছরের বাচ্চাদের হতে পারে। আগে জুভেনাইল ডায়াবেটিস বলতে যাকে বোঝানো হত, অর্থাৎ টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সূত্রপাত হয় আর একটু বড় বয়সে, সাধারণত ৫-১০ বছরের বাচ্চাদের মধ্যে শুরু হয়। তৃতীয় ধরন হল মডি (MODY) অর্থাৎ ম্যাচিওরিটি অনসেট ডায়াবেটিস অফ দ্য ইয়ং। সাধারণ ভাবে ১৫-১৬ বছর বা আর একটু বেশি বয়সে এর সূত্রপাত হয়। এ ছাড়া, কোভিডের পর থেকে দেখা যাচ্ছে কমবয়সীরাও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। বছর কুড়ির ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।”
ছোটদের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এই চারটি আলাদা ধরন তবে চেনা যাবে কী ভাবে? কীভাবেই বা তাঁর চিকিৎসা হবে? সে পরামর্শও দিয়েছেন ড. আশিস মিত্র। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
নিওনেটাল ডায়াবেটিস – একেবারে ছোটদের এই রোগ নির্ণয় করা যায় জেনেটিক টেস্টিং পদ্ধতিতে। ঠিক সময়ে ধরা পড়লে এর চিকিৎসায় ওষুধেই কাজ হয়।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস – ৫ থেকে ১০ বছরের বাচ্চাদের এই রোগ আছে কিনা বুঝতে হলে দু’রকম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করতে হয়। অ্যান্টিগ্যাড অ্যান্টিবডি এবং অ্যান্টি আইলেট সেল অ্যান্টিবডি (আইএ২ অ্যান্টিবডি)। পরীক্ষার ফল যদি পজিটিভ হয়, তবে শিশুটি টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ ক্ষেত্রে বাচ্চা খুব রোগা হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকে অনেকটাই। কিছু ক্ষেত্রে ওজনও কমতে পারে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের ক্লাসিক লক্ষণগুলো দেখা দেয় রোগীর শরীরে। অর্থাৎ, বার বার প্রস্রাব হয়, বেশি খেতে ইচ্ছে করে, ঘন ঘন জলতেষ্টা পায় কিংবা ওজন কমে যায়। এ ক্ষেত্রে সারাজীবন ইনসুলিন দিয়েই চিকিৎসা করতে হবে।
মডি – এই ডায়াবেটিসও ধরা পড়ে জেনেটিক টেস্টিংয়ে। এই রোগের অনেকগুলো প্রকারভেদ আছে। রোগ নির্ণয়ে তাই পরিবারের তিন প্রজন্মের মেডিক্যাল হিস্ট্রি খতিয়ে দেখা হয়। এই রোগে আক্রান্তরাও রোগা হয়। তবে এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটা সুবিধা হল— সালফোনিলিউরিয়া বলে এক ধরনের ওষুধ ব্যবহার হয়। আলাদা করে ইনসুলিন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না আর।
ছোটদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস – এখনকার কমবয়সীদের জীবনযাত্রার ধরনই আরও বেশি করে এই রোগ ডেকে আনছে, বিশেষত কোভিড কালের পর থেকে। যথেচ্ছ পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খাওয়া, অতিরিক্ত সময়ে মোবাইল-কম্পিউটারে ডুবে থেকে এবং পড়াশোনা-সহ নানা ব্যস্ততায় শারীরিক কসরত না করা ওবেসিটির সমস্যা ডেকে আনছে কম বয়সেই। আর তার জেরেই দেখা দিচ্ছে টাইপ ২ ডায়াবেটিস। যার জেরে পেটের অংশ মোটা হয়ে যায়। এ রোগ নির্ণয়ে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। যেহেতু শরীর ইনসুলিন-রেসিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ছে, তাই ইনসুলিন সেনসিটাইজার জাতীয় ওষুধেই কাজ হবে। সেই সঙ্গেই পাল্টাতে হবে জীবনযাত্রার ধরন। তাতে এই ডায়াবেটিসের সমস্যা কমিয়ে ফেলাও সম্ভব।
সুতরাং, চাই শুধু খানিকটা বাড়তি সচেতনতা আর রোগ চেনার পরে তার সঙ্গে লড়াইয়ের মনোবল। তার জোরেই ডায়াবেটিস হলেও ভাল থাকবে আপনার আদরের সন্তান।
(Feed Source: zeenews.com)
