)
২০২৬ সালের শুরু থেকেই বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সোনা, রুপো এবং খনিজ তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারী—সকলকেই ভাবিয়ে তুলেছে। মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬-এর বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, একদিকে মার্কিন ডলারের শক্তিবৃদ্ধি সোনার দামে কিছুটা ‘সংশোধন’ বা পতন ডেকে এনেছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা তেলের বাজারকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে।
সোনা ও রুপোর বর্তমান বাজার চিত্র
চলতি বছরের শুরু থেকে সোনা ও রুপোর দামে যে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল, এপ্রিলে এসে তাতে কিছুটা ভাঁটা পড়েছে। আজকের বাজার দর অনুযায়ী, মূল্যবান এই ধাতু দুটি একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
আরও পড়ুন:
এমসিএক্স (MCX) ও খুচরো বাজার: ভারতের মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে আজ সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১,৪৯,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
শহরভেদে দর: খুচরো বাজারে ২৪ ক্যারাট সোনার গড় দাম প্রতি গ্রামে প্রায় ১৪,৯৮৪ টাকা। কলকাতা ও মুম্বাইয়ে ২৪ ক্যারাট সোনার দাম ১৪,৯৮৪ টাকা হলেও দিল্লিতে তা প্রায় ১৪,৯৯৯ টাকা। চেন্নাইয়ে এই দর সবথেকে বেশি, প্রতি গ্রাম ১৫,১২০ টাকা।
রুপোর অবস্থান: ১ কেজি রুপোর দাম বর্তমানে ২,৩১,০০০ থেকে ২,৩৩,০০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। শিল্পক্ষেত্রে রুপোর চাহিদা বাড়ায় এর দামও ঐতিহাসিকভাবে উচ্চস্তরে রয়েছে।
আরও পড়ুন:
কেন কমছে সোনার দাম?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দাম আকাশছোঁয়া থাকার পর আজ যে সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, তার নেপথ্যে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করছে:
১. শক্তিশালী মার্কিন ডলার ও ট্রেজারি ইল্ড: বিশ্ববাজারে ডলার সূচক (Dollar Index) শক্তিশালী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা কিছুটা কমেছে। ডলারের মান বাড়লে অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের কাছে সোনা কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, যার ফলে দামে পতন ঘটে।
২. মুনাফা সংগ্রহ (Profit Booking): সোনার দাম ১০ গ্রামে দেড় লক্ষ টাকার গণ্ডি স্পর্শ করার পর অনেক বড় বিনিয়োগকারী তাদের সঞ্চিত সোনা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেছেন। এই বিক্রির চাপের কারণেই এমসিএক্স-এ সোনার ফিউচার প্রাইস আজ কিছুটা নিম্নমুখী।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের হুমকি ও তেলের বাজারে অস্থিরতা
সোনার বাজারে সামান্য স্বস্তি মিললেও জ্বালানি তেলের চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যে কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছেন, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দামে।
ইরান যদি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বিঘ্নিত হবে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরান এই পথে বাধা দিলে মার্কিন বিমানবাহিনী তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পরিকাঠামোয় হামলা চালাবে। এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই (WTI) উভয় তেলের দামই আজ ঊর্ধ্বমুখী এবং প্রতি ব্যারেলে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভারতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা
ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ওপর। এছাড়া ডলারের শক্তিবৃদ্ধি এবং তেলের উচ্চমূল্যের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় টাকার মূল্য আরও হ্রাস পাওয়ার বা অবমূল্যায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা ‘Wait and Watch’ বা ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ধীরে চলো নীতি (Buy on Dips): কোটাক মহিন্দ্রা এএমসি-র মতো সংস্থার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে অস্থিরতা থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে সোনার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তাই দাম যখনই কিছুটা কমবে, তখন অল্প অল্প করে কেনা শুরু করা যেতে পারে।
রুপোর সম্ভাবনা: দীর্ঘ মেয়াদে রুপো সোনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে রুপোর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এটি একটি ভালো বিনিয়োগ হতে পারে।
পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য: মোট বিনিয়োগের ৫-১০ শতাংশ সোনা বা রুপোর ইটিএফ (ETF) বা মিউচুয়াল ফান্ডে রাখা উচিত, যা শেয়ার বাজারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেবে।
মুনাফা সংগ্রহ: যারা অনেক আগে কম দামে সোনা কিনেছিলেন, তারা এই উচ্চমূল্যের বাজারে আংশিক মুনাফা সংগ্রহ (Profit Booking) করে নিতে পারেন।
প্যারামিটার প্রবণতা কারণ
সোনা (২৪ ক্যারাট) সামান্য হ্রাস (সংশোধন) ডলারের শক্তি ও মুনাফা সংগ্রহ
রুপো (প্রতি কেজি) স্থিতিশীল কিন্তু উচ্চ শিল্প চাহিদা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ
অপরিশোধিত তেল তীব্র ঊর্ধ্বমুখী ট্রাম্পের হুমকি ও যুদ্ধ আতঙ্ক
বাজার মেজাজ সতর্ক ও অস্থির ভূ-রাজনীতি ও সুদের হারের ভয়
আগামী ৮ এপ্রিল ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) তাদের নতুন অর্থবর্ষের প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার চাহিদাকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান অর্থনীতি কেবল চার্ট বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরোপুরি ভূ-রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। হুজুগে পড়ে বড় বিনিয়োগ না করে, বিশ্ব রাজনীতির খবরের দিকে নজর রেখে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করাই হবে এই মুহূর্তের শ্রেষ্ঠ কৌশল। মার্কেট যেকোনো সময় বড় ধরনের ‘ইউ-টার্ন’ নিতে পারে, তাই সতর্ক থাকাই শ্রেয়।
(Feed Source: zeenews.com)
