
রাজীব চক্রবর্তী: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট। ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও আমলাদের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকট।
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ, নির্বাচন কমিশন। তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিরোধীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। এবার সংসদীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে আদালতের আঙিনায় পৌঁছল বিরোধী জোট। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আনা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব সংসদীয় স্তরে খারিজ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বুধবার বিকেলে দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অফ ইন্ডিয়া-তে এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনের ডাক দেয় ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট।
সামনেই ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, তার আগেই কমিশনের শীর্ষ পদের নিরপেক্ষতা নিয়ে এই নজিরবিহীন টানাপোড়েন দেশের রাজনৈতিক আবহকে তপ্ত করে তুলেছে।
আইনি লড়াইয়ের পথে বিরোধীরা
গত ৬ই এপ্রিল লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন ১৯৩ জন বিরোধী সাংসদের স্বাক্ষর সম্বলিত ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবটি খারিজ করে দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, প্রস্তাবের পেছনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসদাচরণের অভাব রয়েছে।
প্রতিবাদে বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন, কংগ্রেসের জয়রাম রমেশ-সহ বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতারা সরব হন। তাঁদের দাবি, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আলোচনার সুযোগ না দিয়েই প্রস্তাব বাতিল করা আসলে ‘অসাংবিধানিক’ এবং ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’। সংসদের পথ রুদ্ধ হওয়ায় বিরোধীরা এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
‘চার্জশিট’
বিরোধী জোট জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মূলত সাত দফা অভিযোগ সামনে এনেছে। এর মধ্যে প্রধান:
পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ: নির্বাচনী নির্ঘণ্ট থেকে শুরু করে আদর্শ আচরণবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে শাসকদলের প্রতি ‘নরম’ মনোভাব।
ভোটার তালিকায় কারচুপি: পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR)-এর নামে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা: নিয়োগের সময় বিরোধী দলনেতার ভিন্নমতকে (Dissent Note) গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টিও আইনি লড়াইয়ের প্রধান ভিত্তি হতে যাচ্ছে।
কোচবিহারের নির্বাচনী পর্যবেক্ষণের অপসারণ
অন্যদিকে, জ্ঞানেশ কুমারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ঘিরেও বিতর্ক। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে কমিশনের অতি-সক্রিয়তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তুঙ্গে। কোচবিহারের পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে কোচবিহারের আমলা অনুরাগ যাদবের সঙ্গে সরাসরি বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন সিইসি।
বুথ সংখ্যা নিয়ে সঠিক তথ্য দিতে না পারায় জ্ঞানেশ কুমার তাঁকে ‘Go back to your home’ বলে তীব্র ভর্ত্সনা করেন। এর পাল্টায় ২৫ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ওই আমলাও নিজের আত্মসম্মান নিয়ে সওয়াল করেন। বুধবারই অনুরাগ যাদবকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেয় কমিশন।
কমিশন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬-এর ভোটে কোনও রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না এবং ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ তাড়াতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে কোচবিহারের মতো স্পর্শকাতর এলাকা যার সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত আছে ভারতের–চ্যাংড়াবান্দা, বক্সীহাট, মেখলিগঞ্জ, দিনহাটা, শীতলকুচি– এইসমস্ত চেকপোস্ট দিয়ে বাংলদেশী অনুপ্রবেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কোনওভাবেই মানা হবে না।
ইমপিচমেন্ট ও বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার রূপরেখা
পদক্ষেপ বিবরণ
সংসদীয় পর্যায় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে স্পিকারের আপত্তিতে আটকে গেছে।
আইনি যুক্তি বিরোধীরা দাবি করছেন যে, প্রস্তাব বাতিল করার কারণটি সংসদীয় এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা অতীতে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ বিধি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কড়া পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এবারও নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না, সেটাই দেখার।
শাসকদল বিজেপি এই পুরো ঘটনাকে ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অপমানের চেষ্টা’ বলে দাবি করেছে। তাদের মতে, নির্বাচনে হারের আশঙ্কায় বিরোধীরা কমিশনের ওপর দায় চাপাচ্ছে।
কিন্তু ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের মতে, এই সর্বাত্মক বিক্ষোভ কেবল অপসারণের লড়াই নয়, বরং ‘ভোট চুরির’ বিরুদ্ধে এবং অবাধ নির্বাচনের দাবি আদায়েরই সংগ্রাম।
দেশের শীর্ষ আদালত এই মামলা গ্রহণ করবে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে ভারতের নির্বাচনী সংস্কারের ভবিষ্যৎ। তবে ২০২৬-এর নির্বাচনী পরীক্ষার আগে নির্বাচন কমিশন ও বিরোধীদের এই সংঘাত নবান্ন থেকে দিল্লি—সর্বত্রই এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
(Feed Source: zeenews.com)
