
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হোরমুজ প্রণালী’ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
সাম্প্রতিক গোয়েন্দা ও সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ১৫টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ জলপথ। একে বিশ্বের ‘জ্বালানি ধমনী’ বলা হয়। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাকের মতো দেশগুলো তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই পথের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফলে এই পথে যে কোনো ধরনের বাধা মানেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দামে আগুন লাগা।
ইরানের নতুন সিদ্ধান্ত ও বিধিনিষেধ
তথ্য অনুসারে, ইরান ঘোষণা করেছে যে এখন থেকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে হলে প্রতিটি জাহাজকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) বিশেষ অনুমতি নিতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক ডজন বড় জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, সেখানে এখন থেকে সর্বোচ্চ ১৫টি জাহাজ চলাচলের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইসরায়েলের সাথে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান এই ‘এনার্জি কার্ড’ ব্যবহার করছে। ইরান এর আগেও একাধিকবার এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিলেও, এবার সরাসরি জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বেঁধে দেওয়াকে অত্যন্ত আগ্রাসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব তেলের বাজারে এর প্রভাব
ইরানের এই সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।
১. সরবরাহ ঘাটতি: প্রতিদিন মাত্র ১৫টি জাহাজ যাওয়ার অর্থ হলো তেলের চালানে দীর্ঘসূত্রতা। এতে বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাপক হারে কমে যাবে।
২. মূল্যবৃদ্ধি: সরবরাহ কমলে স্বাভাবিকভাবেই তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে ভারত, চীন এবং ইউরোপের দেশগুলো যারা তেলের আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
৩. পরিবহন খরচ: জাহাজের সংখ্যা সীমিত করায় শিপিং ইন্স্যুরেন্স বা বিমার খরচ এবং মালবাহী জাহাজের ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখছে। মার্কিন নৌবাহিনী ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখন চরমে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বা ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষার যে চেষ্টা চলছিল, ইরানের এই কঠোর অবস্থান তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে যাতে তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। তবে এই সংঘাত যদি সামরিক রূপ নেয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা বিশ্বকে এক গভীর অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ভারত ও এশিয়ার ওপর প্রভাব
ভারত তার অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই নিয়ে আসে। যদি এই জলপথটি আংশিকভাবেও অবরুদ্ধ হয়, তবে ভারতে পেট্রোল-ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হবে।
এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে এবং পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। ভারতের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
হরমুজ নিয়ে ইরানের এই কঠোর মনোভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত। আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকট মেটানো সম্ভব নয়।
যদি কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান না হয় এবং ইরান যদি তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে আগামী কয়েক মাস বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলস এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং তেহরান তাদের অবস্থানে কতটা অনড় থাকে।
(Feed Source: zeenews.com)
