Asha Bhosle: ‘কুছ সামান’ নয়, সংগীতপ্রেমীদের কাছে পড়ে রইল আশার সুবিশাল সুরসাম্রাজ্য; প্রেম কামনা আবেগের উষ্ণতা

Asha Bhosle: ‘কুছ সামান’ নয়, সংগীতপ্রেমীদের কাছে পড়ে রইল আশার সুবিশাল সুরসাম্রাজ্য; প্রেম কামনা আবেগের উষ্ণতা

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতীয় লঘুসংগীত জগতের মহিলা ব্রিগেডের ‘ফ্যাব থ্রি’ কে? বহু তর্কবিতর্ক উঠতেই পারে। বাদ-প্রতিবাদও। কিন্তু সম্ভবত বহুজন একমত হবেন মাত্র তিনটি নামে এসে– গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। চলে গেলেন সেই ত্রয়ীরই শেষজন। ৯২ বছর বয়সে চেলে গেলেন ভারতীয় লঘুসংগীত ও হিন্দি প্লেব্যাক সিংগিংয়ের মুকুটহীনা সম্রাজ্ঞী। আশা ভোঁসলের মৃত্যুর (Asha Bhosle death) সঙ্গেই ভারতীয় পপ সংগীতের আশালতাটি চিরতরে নির্মূল হয়ে গেল।

আশার গানযাত্রা

আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে এক সংগীত পরিবারে জন্ম। বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মরাঠি সংগীতমঞ্চের একজন অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। আশার যখন নয় বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা মারা যান। তখন তাঁদের পরিবার পুণে থেকে কোহলাপুর এবং পরে মুম্বইয়ে চলে আসে। আশা ও তাঁর দিনি লতা মঙ্গেশকর তাঁদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সিনেমায় গান গাওয়া ও অভিনয় শুরু করেন। সেই পর্বে আশার গাওয়া প্রথম গান হল মারাঠি ভাষার মাঝা বল (১৯৪৩) ছবিতে ‘চল চল নব বল’। হিন্দি চলচ্চিত্রের গানে আশার অভিষেক হয় হংসরাজ বেহলের চুনারিয়া (১৯৪৮) ছবিতে ‘সাবন আয়া’ গানে। তবে হিন্দি ছবিতে আশার প্রথম একক গান ছিল ‘রাত কী রানী’ (১৯৪৯) ছবিতে।

‘মেরা কুছ সামান…’ 

একদা ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’ (Mera kuch saamaan tumhare paas pada hai) গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। যে শব্দ ক’টির অর্থ আমরা সবাই জানি– আমার কিছু জিনিস, যা তোমার কাছে পড়ে আছে! কী পড়ে আছে? কী পড়ে থাকতে পারে একজন শিল্পীর? তাঁর সৃজিত শিল্প বই তো নয়? কেমন সে শিল্প? বিশাল তার সম্ভার, বিপুল তার ব্যাপ্তি, বহুধা তার প্রবাহ, অশেষ তার গভীরতা। খুব সংক্ষেপেও যদি একঝলক দেখে নেওয়া যায় আশার সামগ্রিক কেরিয়ারে দিকে, তাহলে অন্তত তাঁর শিল্পীজীবনের যে-যে মাইলস্টোনগুলিকে মনে রাখতেই হবে, সেগুলিও কম নয়। আপাতত সেই খঞ্জ প্রয়াসই করা যাক।

ও. পি. নইয়ার

আশার বিশাল শিল্পীজীবনকে সুবিধার জন্য খুব সংক্ষেপে চারটি সিনেমা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এগুলি তাঁর কেরিয়ারের মাইলফলক-স্বরূপ– ছবিগুলি হল: নয়া দৌড় (১৯৫৭), তিসরি মঞ্জিল (১৯৬৬), উমরাও জান (১৯৮১) রঙ্গিলা (১৯৯৫)। তবে, আশার সংগীতজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় বিষয় সম্ভবত– ও. পি. নইয়ার। বলতে গেলে ও. পি. নইয়ারের হাতেই আশার ‘জন্ম’। ও. পি. নইয়ারের সঙ্গে আশার প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৫২ সালে– ‘ছম ছম ছম’ গানে। তবে, ‘নয়া দৌড়’ (১৯৫৭) চলচ্চিত্রের গান দিয়েই আশা-ওপি যুগলের জনপ্রিয়তা অর্জনের শুরু।

রাহুল দেব বর্মণ

সাতটি দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাওয়া আশার সংগীতজীবন বিশাল বিপুল অপরিমেয়। তার হিসাবনিকাশ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে গেলে ও.পি.র পরে একেবারে রাহুল দেব বর্মন তথা আর.ডি-র কথা বলা জরুরি। কেননা, আশার মিউজিক্যাল জার্নিতে আর.-ডি-র আলাদা একটা জায়গা আছে। আশা ও রাহুল দেববর্মনের প্রথম কাজ ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬) ছবিতে। পরবর্তীকালে এই যুগল হিন্দি গানের ফ্রেমে একে একে গেঁথে দেয় ক্যাবারে, রক, ডিস্কো আবার গজল ও সেমি ক্ল্যাসিকাল-সহ বিভিন্ন ধারার গান। ১৯৭০-এর দশকে আশা ও রাহুল জুটিই বলিউডে সরাসরি পশ্চিমি ধারার গান নিয়ে আসেন। ‘ক্যারভান’ ছবিতে ‘পিয়া তু অব তো আ জা’, ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ ছবিতে ‘দম মারো দম’, আপনা দেশ ছবিতে ‘দুনিয়া মেঁ’ এবং ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’ চলচ্চিত্রতে ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’ গানের মধ্যে দিয়ে।

আশা ও বাংলা গান

বাংলা গানও বিপুল ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে আশার গানে। গেয়েছেন বাংলা নন-ফিল্ম, ফিল্ম, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি। সুধীন দাশগুপ্তের সুরে তাঁর আসাধারণ সব কাজ হল অফ ফেমে ঢুকে গিয়েছে– আকাশে আজ রঙের খেলা (১৯৫৮), আরো দূরে চলো যাই (১৯৭১), সাগর ডাকে আয় (১৯৭২), মন মেতেছে (১৯৭২)। এছাড়াও যেসব বাংলাগান বাঙালি সংগীতপ্রেমীর মুখে-মুখে ফেরে, তার মাত্র কয়েকটি হল– যাব কি যাব না ভেবে ভেবে (১৯৬৮), কোন্ সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে (১৯৬৯), চোখে চোখে কথা বলো (১৯৭১), আমি অন্ধকারের যাত্রী (১৯৭৩), আয় চলে আয় (১৯৭৩), মহুয়ায় জমেছে আজ (১৯৭৪), সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি বসে (১৯৭৪)! বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার গান গাওয়া আশার বাংলা গানের সংখ্যাই অনেক। বলে শেষ করা যাবে না।

পুরস্কার

আশা দু’টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Awards) পেয়েছেন। রয়েছে ১৮টি মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার  (Maharashtra State Film Awards)। তাঁর মুকুটে রয়েছে চারটি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার (BFJA Awards), ন’টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (Filmfare Awards)। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দু’টি গ্র্যামি পুরস্কারের মনোনয়নও। ২০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হন আশা। ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণে সম্মানিত করে। ২০১৮ সালে পান বঙ্গবিভূষণ, ২০২১ সালে মহারাষ্ট্র ভূষণ পদকেও ভূষিত হন আশা।

গিনেসে আশা

২০০৬ সাল নাগাদ আশা ভোঁসলে একবার বলেছিলেন যে, দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি ১২০০০-এরও বেশি গান গেয়েছেন! অবিশ্বাস্য একটা সংখ্যা! শুধু তাই নয়, ২০১১ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে সর্বাধিক সংখ্যক গান রেকর্ডকারী হিসেবে ঘোষণাও করে!

(Feed Source: zeenews.com)