Private Practice bans of government doctors: বিগ ব্রেকিং: বন্ধ হল সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস, বেনজির নির্দেশে ডাক্তারদের হইচই, আন্দোলন

Private Practice bans of government doctors: বিগ ব্রেকিং: বন্ধ হল সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস, বেনজির নির্দেশে ডাক্তারদের হইচই, আন্দোলন

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং সাধারণ মানুষের দুয়ারে চিকিৎসা পৌঁছে দিতে এক নজিরবিহীন ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নীতিশ কুমারের নেতৃত্বাধীন বিহার সরকার। গত শনিবার (১১ এপ্রিল, ২০২৬) এক সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে যে, বিহারের সরকারি হাসপাতালে কর্মরত কোনও চিকিৎসকই এখন থেকে আর ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ বা ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের ‘সাত নিশ্চয়-৩’ (Saat Nischay-3) কর্মসূচির অধীনে। মূল লক্ষ্য হল ‘সুগম স্বাস্থ্য, সুরক্ষিত জীবন’।

সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট:

দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে, বিহারের সরকারি চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ ডিউটি চলাকালীন বা নির্ধারিত সময়ের পর ব্যক্তিগত ক্লিনিকে সময় দেন বেশি। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আসা দরিদ্র রোগীরা সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ পান না এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের কৌশলে বেসরকারি হাসপাতালে রেফার করে দেওয়ার অভিযোগও ছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার তার ‘সমৃদ্ধি যাত্রা’র সময় পশ্চিম চম্পারণে এই বিষয়টি নিয়ে জনরোষের সম্মুখীন হন এবং তখনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সরকার একটি কঠোর নীতি আনতে চলেছে।

বিজ্ঞপ্তির মূল বিষয়:

রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের জারি করা রেজোলিউশন অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা তিনটি প্রধান ক্যাডারের চিকিৎসকদের ওপর প্রযোজ্য হবে:

১. বিহার স্বাস্থ্য পরিষেবা (Bihar Health Services)

২. বিহার মেডিকেল এডুকেশন সার্ভিস (Bihar Medical Education Services)

৩. ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওলজি (IGIC) মেডিকেল সার্ভিস

বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের জন্যও এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখন থেকে সরকারি চিকিৎসকদের পূর্ণ সময় সরকারি হাসপাতালেই ব্যয় করতে হবে।

নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স (NPA) ঘোষণা:

প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধের ফলে চিকিৎসকদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার ‘নন-প্র্যাকটিসিং অ্যালাউন্স’ (NPA) চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এনপিএ-র সুনির্দিষ্ট হার সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশিকা খুব শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে এটি মূল বেতনের একটি উল্লেখযোগ্য শতাংশ (সাধারণত ১৫% থেকে ২০%) হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের সরকারি প্রতিষ্ঠানেই পূর্ণ মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সম্ভাব্য প্রভাব:

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিহারের গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।

চিকিৎসকদের উপস্থিতি: সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে ওপিডি (OPD) এবং জরুরি বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে।

রেফারেল সিন্ডিকেট রোধ: সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী সরানোর যে প্রবণতা রয়েছে, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

দরিদ্র রোগীদের সুবিধা: বিহারের সিংহভাগ মানুষ যারা অর্থের অভাবে বেসরকারি চিকিৎসা নিতে পারেন না, তারা এখন সরকারি হাসপাতালেই উন্নতমানের বিশেষজ্ঞ পরিষেবা পাবেন।

যে সিদ্ধান্ত নীতিশ কুমার সরকার গ্রহণ করেছে, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন চিকিৎসক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, কোনও ধরণের আলোচনা ছাড়াই এই একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং চিকিৎসকদের পেশাদার স্বাধীনতার ওপর আঘাত।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

বিহারের চিকিৎসকদের প্রধান সংগঠনগুলো—যেমন ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (IMA) এবং বিহার হেলথ সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন (BHSA)—সরকারের এই ‘বাধ্যতামূলক’ নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করেছে।

চিকিৎসকদের মতে, এই ধরণের নিষেধাজ্ঞা কেবল চিকিৎসকদের নয়, সাধারণ রোগীদেরও সমস্যায় ফেলবে। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরকারি ডিউটির পর ব্যক্তিগতভাবে এমন রোগীদের দেখেন যারা সরকারি হাসপাতালের ভিড় এড়াতে চান। এই পরিষেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বেসরকারি পরিকাঠামোর ওপর চাপ পড়বে এবং চিকিৎসকরাও আর্থিক ও পেশাদারভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

চিকিৎসকদের দাবি 

আবেদনকারী চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে সবথেকে বড় দাবি হলো একটি নমনীয় বা ফ্লেক্সিবল পলিসি (Flexible Policy)। চিকিৎসকরা চান না যে এনপিএ (Non-Practicing Allowance) বা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করা সবার ওপর বাধ্যতামূলক হোক। তাঁদের প্রস্তাবগুলো হল:

বিকল্প পছন্দ (Opt-in/Opt-out): যে চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস করতে চান না, তাঁরা এনপিএ গ্রহণ করবেন। কিন্তু যাঁরা নিজের উদ্যোগে রোগী দেখতে চান, তাঁদের সেই স্বাধীনতা দেওয়া হোক এবং সেক্ষেত্রে তাঁরা এনপিএ নেবেন না।

পর্যাপ্ত এনপিএ-র দাবি: চিকিৎসকদের একাংশের অভিযোগ, সরকার যে পরিমাণ এনপিএ দেওয়ার কথা ভাবছে তা মুদ্রাস্ফীতির বাজারে অত্যন্ত নগণ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের বা অন্যান্য উন্নত রাজ্যের সমতুল্য ভাতা না দিলে মেধাবী চিকিৎসকরা বিহার ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যেতে পারেন।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন:

আইএমএ-র প্রতিনিধিরা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন যে, সরকার কি কেবল চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করলেই উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে পারবে? তাঁদের মতে, বিহারের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, উন্নত ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং দক্ষ প্যারামেডিক্যাল স্টাফের অভাব রয়েছে। চিকিৎসকদের ডিউটির পর রোগী দেখা বন্ধ করার আগে হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি। চিকিৎসকরা মনে করছেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতেই ডাক্তারদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

মেডিকেল কলেজের অধ্যাপকদের উদ্বেগ:

বিহারের মেডিকেল কলেজগুলোতে কর্মরত সিনিয়র ডাক্তার ও অধ্যাপকদের মধ্যে এই ক্ষোভ সবথেকে বেশি। তাঁদের মতে, শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁরা গবেষণার কাজও করেন। ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস বন্ধ হলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা সরকারি চাকরি ছেড়ে বড় কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা কর্পোরেট চেইন হাসপাতালে চলে যেতে পারেন। এতে রাজ্যের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা (Medical Education) ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।

সরকারের প্রতি চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা:

চিকিৎসক সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে সরকারকে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। সেখানে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, যদি সরকার এই নির্দেশিকা প্রত্যাহার বা সংশোধন না করে, তবে তাঁরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। প্রয়োজনে তাঁরা কর্মবিরতির পথেও হাঁটতে পারেন। বিহার হেলথ সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বলেন, “আমরা রোগীর স্বার্থে কাজ করতে চাই, কিন্তু চিকিৎসকদের সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিয়ে তাদের কোণঠাসা করা হলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরেই পড়বে।”

কী কী চ্যালেঞ্জ হতে পারে?

তবে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চিকিৎসক সংগঠনগুলোর একাংশ মনে করছে, পর্যাপ্ত এনপিএ এবং উন্নত পরিকাঠামো নিশ্চিত না করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করলে মেধাবী চিকিৎসকরা সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাতে পারেন।

এছাড়া, অবৈধভাবে কেউ প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছে কি না, তা তদারকি করার জন্য একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। এর আগে ২০০০ সালের বিহারে এই ধরণের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

বিহার সরকারের এই অনন্য় পদক্ষেপ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি সঠিকভাবে এটি রূপায়িত হয়, তবে বিহার দেশের অন্যান্য রাজ্যের কাছে একটি রোল মডেল হবে। ‘সাত নিশ্চয়-৩’ কর্মসূচির অধীনে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিহার সরকার এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সহযোগিতা এবং প্রশাসনিক নজরদারি কতটুকু ফলপ্রসূ হয়।

(Feed Source: zeenews.com)