)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: যুদ্ধটা হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়। কিন্তু তার আঁচ লাগছে ভারতে। পেট্রোলের দাম, রান্নার গ্যাস, সারের জোগান থেকে ওষুধের দাম, সবই টলমল করছে সেই দূর দেশের লড়াইয়ের ধাক্কায়।
এই ছবিটাকেই সংখ্যার ভাষায় বলল রাষ্ট্রপুঞ্জ। ইউএনডিপি (UNDP)-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকলে ভারতে অতিরিক্ত ২৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে নেমে যেতে পারেন।
রিপোর্টে কী আছে?
‘মিলিটারি এস্কালেশন ইন দ্য মিডল ইস্ট: হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্টস অ্যাক্রস এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ নামের এই রিপোর্টে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৬টি দেশ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ভারতের দারিদ্র্যের হার ২৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪.২ শতাংশ হতে পারে। সংখ্যায় বললে, প্রায় ২৪ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ নতুন করে গরিব হয়ে যাবেন।
গোটা বিশ্বে এই সংঘর্ষের জেরায় ভয়ানক দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারেন প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ। আর শুধু এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আর্থিক ক্ষতি ছুঁতে পারে ২৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভারত এত বিপদে কেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটাই জায়গায়, তেল।
ভারত তার মোট তেলের চাহিদার ৯০ শতাংশেরও বেশি বাইরে থেকে কেনে। তার মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি অশোধিত তেল এবং প্রায় ৯০ শতাংশ রান্নার গ্যাস আসে পশ্চিম এশিয়া থেকেই। হরমুজ প্রণালীতে যখনই গোলমাল বাধে, সেই চাপ সরাসরি পড়ে ভারতের পাম্প থেকে রান্নাঘরে।
কৃষিও নিরাপদ নয়। ভারতের মোট সার আমদানির ৪৫ শতাংশেরও বেশি আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। দেশীয় ইউরিয়া তৈরির ৮৫ শতাংশও নির্ভর করে আমদানি করা গ্যাসের উপর। সার সংকট মানে শেষমেশ খাবারের দাম বাড়া। আর তার মার সবার আগে পড়ে কম আয়ের মানুষের ঘরে।
বাণিজ্যের ছবিটাও ভালো নয়। ভারতের রফতানির ১৪ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় ২১ শতাংশ পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে জুড়ে আছে। বাসমতি চাল, চা, গহনা, পোশাক সহ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি গালফের বাজারের উপর নির্ভরশীল।
প্রবাসী শ্রমিকদের কী অবস্থা?
বিদেশ মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪-এর অক্টোবর পর্যন্ত ৯৩ লাখেরও বেশি ভারতীয় গালফের দেশগুলিতে কাজ করেন। দেশে যে মোট রেমিট্যান্স আসে, তার ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ আসে ওই দেশগুলো থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় কাজকর্ম কমলে সেই টাকার প্রবাহও কমবে। ফলে সরাসরি সমস্যায় পড়বেন লক্ষ লক্ষ পরিবার।
ওষুধ থেকে চাকরি, সংকট সব জায়গায়
রিপোর্ট বলছে, হরমুজ প্রণালীতে সমস্যার কারণে চিকিৎসা সরঞ্জামের কাঁচামালের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে ওষুধের পাইকারি দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।
ছোট ও মাঝারি ব্যবসাও সংকটে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, নির্মাণ, ইস্পাত, গহনা শিল্পে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, অর্ডার কমছে। ভারতের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে। তাদের হাতে কোনো সঞ্চয়ের বালাই নেই।
কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভারতের মুদ্রাস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী। পাইকারি মূল্য সূচক (WPI) ভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতি ফেব্রুয়ারির ২.১৩ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে মার্চে ৩.৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিই এই স্ফীতির প্রধান কারণ।
মূল্যবৃদ্ধির খতিয়ান
জ্বালানি ও শক্তি: ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে এই খাতে দাম বেড়েছে ৪.১৩ শতাংশ। বিশেষত খনিজ তেলের দাম ৮.৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও বিদ্যুতের দাম ৫.০৭ শতাংশ কমেছে।
খুচরো মুদ্রাস্ফীতি: মার্চ মাসে খুচরো মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩.৪ শতাংশে। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় হার ৩.৬৩ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৩.১১ শতাংশ।
খাদ্যদ্রব্য: খাদ্য মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারির ৩.৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে মার্চে ৩.৮৭ শতাংশ হয়েছে। টমেটো (৩৫.৯৯%) এবং ফুলকপির (৩৪.১১%) দাম বাড়লেও পেঁয়াজ ও আলুর দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে।
মানব উন্নয়ন সূচকেও পিছিয়ে পড়তে পারে ভারত। রিপোর্টের হিসেব বলছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ভারতের অগ্রগতি ০.০৩ থেকে ০.১২ বছর পিছিয়ে যাবে।
সরকার নড়েছে, তবু চাপ কমছে না
কিছু দেশের সরকার জ্বালানি ভর্তুকি ও দাম ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউএনডিপি সতর্ক করছে, এতে সরকারি কোষাগারে চাপ আরও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হিসেবে সংস্থাটি বলছে, স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে হবে, জ্বালানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে।
ইউএনডিপির এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কান্নি উইগনারাজা (Kanni Wignaraja) বলেছেন, এই যুদ্ধের চাপ এশিয়ার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে, এবং তা সরকারের পদক্ষেপের গতির চেয়ে অনেক দ্রুত।
বোমা ফাটছে হাজার মাইল দূরে। কিন্তু কম্পন এসে লাগছে সেই মানুষটার ঘরে, যিনি মাসশেষে সংসারের হিসেব মেলাতে পারছেন না।
বলাই বাহুল্য, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহজনিত চাপের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সোনা, হিরে ও রুপোর গয়নার দামেও আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) জানিয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকলেও বৈশ্বিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাহ্যিক ধাক্কা আরও তীব্র হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতির এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের পকেটে টান দিচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
(Feed Source: zeenews.com)
