জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তাঁর সাজানো সংসার। স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়ে জীবন যখন স্থবির, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসে হাজির হল ব্রিটিশ সরকারের নির্বাসন নোটিস।
এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনায় পরিবারের সমস্ত সদস্যকে হারানো ওই ব্যক্তিকে এবার ব্রিটেন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অমানবিক সিদ্ধান্তের খবর সামনে আসতেই ব্রিটেনের মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমবেদনা।
এক নিমিষেই শেষ সাজানো সংসার
২০২৫ সালের ১২ জুন। আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান উড্ডয়নের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ওই বিমানে সপরিবারে ফিরছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওই ব্যক্তি (আইনি কারণে তাঁর নাম অনেক জায়গায় গোপনীয় রাখা হয়েছে)। দুর্ঘটনায় বিমানের ২৪১ জন যাত্রী প্রাণ হারান, যার মধ্যে তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের মতো প্রিয়জনেরা ছিলেন। ওই ব্যক্তি নিজে কোনওভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও বা সেই সময়ে বিমানে না থাকলেও, এক নিমিষেই তাঁর গোটা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।
কেন এই নির্বাসন নোটিশ?
তদন্তে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি ব্রিটেনে মূলত তাঁর স্ত্রীর ‘ডিপেন্ডেন্ট ভিসা’ (Dependent Visa) বা নির্ভরশীল হিসেবে বসবাস করছিলেন। ব্রিটিশ অভিবাসন আইন অনুযায়ী, যদি মূল ভিসা আবেদনকারীর (এক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী) মৃত্যু হয় বা তিনি দেশে না থাকেন, তবে সেই ভিসার অধীনে থাকা নির্ভরশীলদের আইনি বৈধতাও বাতিল হয়ে যায়।
তিনি ২০২২ সালের মার্চ মাসে ভারত থেকে তাঁর স্ত্রী সাদিকাবানু-র স্টুডেন্ট ভিসার ওপর নির্ভরশীল (ডিপেন্ডেন্ট) হিসেবে যুক্তরাজ্যে (UK) এসেছিলেন। সে সময় সাদিকাবানু লন্ডনের আলস্টার ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করছিলেন।
এই দম্পতির ফাতিমা নামে এক কন্যা সন্তান ছিল, যার জন্ম ব্রিটিশ মাটিতে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সাদিকাবানু দুই বছরের গ্র্যাজুয়েট ভিসায় লন্ডনে চলে আসার পরেই তাঁরা ওখানেই থাকছিলেন।
কেন এই ঘটনা?
সাদিকাবানু ‘রাগবি’ নামের একটি কোম্পানিতে-একটি নতুন চাকরি শুরু করেছিলেন এবং ২০২৬ সাল থেকে ইংল্যান্ডে থাকার জন্য একটি ‘স্কিলড ওয়ার্কার’ ভিসার আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়ই এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনায় নিজের মেয়ের সঙ্গেই তাঁর মৃত্যু হয়।
গত বছরের ১২ জুন অহমদাবাদ থেকে লন্ডনগামী সেই বিমান ওড়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ভেঙে পড়ে । এই দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন ভারতীয় নাগরিক, ৫৩ জন ব্রিটিশ, ১ জন কানাডীয় এবং ৭ জন পর্তুগিজ নাগরিক নিহত হন।
এক মুহূর্তের ব্যবধানে ডেলিভারি ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ তাঁর নিকটতম পরিবার এবং যুক্তরাজ্যে থাকার আইনি পথ—দুটোই হারিয়ে ফেলেন।
বিমান দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ কয়েক মাস তিনি শোকস্তব্ধ ছিলেন। তাঁর সমস্ত কাগজপত্র এবং পরিচিতি ছিল তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর (Home Office) তাঁকে জানিয়েছে যে, যেহেতু তাঁর ভিসার ভিত্তি আর অবশিষ্ট নেই, তাই তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্রিটেন ছাড়তে হবে। তাঁর আবেদন ছিল যে, এই কঠিন সময়ে তিনি তাঁর পরিচিত পরিবেশে এবং সামাজিক বন্ধু-বান্ধবদের সাহচর্যে থাকতে চান। কিন্তু সরকারি আমলাতন্ত্রের কাছে তাঁর এই আবেগঘন আর্জি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি।
প্রশাসনের কঠোর ফাঁস
এই ঘটনা ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থার কঠোর মনোভাব এবং সংবেদনহীনতাকে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ওই ব্যক্তির আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ‘তিনি শুধু একজন প্রবাসী নন, তিনি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার। তাঁর পুরো পরিবার ব্রিটিশ মাটির স্মৃতিতে মিশে আছে। এই অবস্থায় তাঁকে জোর করে এমন এক দেশে (ভারত) ফেরত পাঠানো যেখানে তাঁর আর কেউ নেই, তা চরম অমানবিক।’
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যে ব্যক্তি এক লহমায় নিজের স্ত্রী-সন্তানকে হারিয়েছেন, তাঁকে পুনরায় ঘরছাড়া করা মানে তাঁকে মানসিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। তাঁর পাশে দাঁড়ানোর বদলে ব্রিটিশ সরকার যেভাবে আইনের দোহাই দিয়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে বলছে, তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জনসাধারণের ক্ষোভ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ব্যক্তির সমর্থনে সরব হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ‘জাস্টিস ফর দ্য গ্রিভিং ফাদার’ (Justice for the Grieving Father) নামে একটি অনলাইন পিটিশন ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে। বহু ব্রিটিশ নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আইন কি মানুষের জন্য নয়? চরম দুঃখজনক পরিস্থিতিতে কেন বিশেষ বিবেচনা (Compassionate Grounds) করা হবে না?’
ব্রিটেনের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও এই ইস্যুতে মুখ খুলেছেন। তাঁরা স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি একটি বিশেষ ক্ষেত্র যেখানে মানবিকতাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে ওই ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি মামলা আইনের ভিত্তিতে বিচার করা হয় এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার খাতিরে তারা এই নিয়ে কোনও সরাসরি মন্তব্য করবে না। তবে আইনি লড়াই চললেও নির্বাসনের খাঁড়া তাঁর মাথার ওপর ঝুলছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার সেই কালো দিনটি বহু পরিবারকে চিরতরে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন, তাঁদের জীবনের ক্ষত নিরাময়ের বদলে যদি রাষ্ট্রযন্ত্র এভাবে নতুন করে যন্ত্রণা দেয়, তবে তাকে সভ্য সমাজ বলা কঠিন। যে ব্যক্তি আকাশপথের দুর্ঘটনায় সব হারিয়েছেন, তাঁর পায়ের তলার মাটি অন্তত রাষ্ট্র কেড়ে না নিক—এখন এটাই সাধারণ মানুষের প্রার্থনা।
(Feed Source: zeenews.com)
