
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতের সিলিকন ভ্যালি বেঙ্গালুরুতে মর্মান্তিক মৃত্যু। পণের দাবি এবং মানসিক অত্যাচারের জেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন এক তরুণী তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী (Techie)। অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পণের জন্য বিপুল পরিমাণ টাকার জন্য তাঁর ওপর চাপ দিচ্ছিল। শেষমেশ স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের জেদ এবং লাগাতার অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ওই তরুণী। তাঁর নাম ভুবনেশ্বরী।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত তরুণী বেঙ্গালুরুর একটি নামী আইটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। কয়েক বছর আগে দেখাশোনা করে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের সময় কনের পরিবারের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো দানসামগ্রী দেওয়া হলেও বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় অশান্তি। অভিযোগ, স্বামী এবং তাঁর পরিবার আরও পণের দাবিতে তরুণীর ওপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার শুরু করেন। স্বামীর নাম হরিশ কুমার।
পরিবারের দাবি, ওই তরুণী শিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হত। তাঁর স্বামী নিয়মিতভাবে তাঁর বেতন এবং বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দিতেন। এই নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে তাঁদের দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছায়।
বিবাহবিচ্ছেদের চাপ
পুলিসি তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ, পণের টাকা না পাওয়ায় স্বামী ওই তরুণীকে ক্রমাগত বিবাহবিচ্ছেদের (Divorce) জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, টাকা না দিলে তিনি এই সম্পর্ক আর এগিয়ে নিয়ে যাবেন না। একজন আত্মমর্যাদাশীল নারীর কাছে এই অপমান অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
মৃতার পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার দিনও তাঁদের মধ্যে তীব্র বচসা হয়েছিল। স্বামী তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং আইনি নোটিস পাঠানোর হুমকি দেন। এই চরম মানসিক যন্ত্রণায় ওই আইটি কর্মী আত্মহননের পথ বেছে নেন বলে প্রাথমিক অনুমান পুলিসের।
পুলিসের পদক্ষেপ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুলিস মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। তরুণীর ঘর থেকে কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ফরেনসিক দল। তবে তরুণীর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিস ইতিমধ্যেই একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করেছে।
ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় স্বামী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘পণ নিগ্রহ’ ও ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ দেওয়ার মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিস ইতোমধ্যেই অভিযুক্ত স্বামীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষিত সমাজে পণের অভিশাপ
এই ঘটনাটি আরও একবার আধুনিক সমাজের অন্ধকার দিক প্রকাশ্যে এনেছে। বেঙ্গালুরুর মতো শহরে, যেখানে নারীরা উচ্চশিক্ষিত এবং ক্যারিয়ারে সফল, সেখানেও পণের মতো প্রাচীন ও কুৎসিত প্রথা কী ভাবে শিকড় গেড়ে বসে আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক স্বাধীনতা থাকলেও অনেক সময় নারীরা সামাজিক সম্মানের খাতিরে বা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার তাগিদে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করেন। এই ঘটনায় স্বামীর বিবাহবিচ্ছেদের হুমকি তরুণীকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল।
মেধাবী এই টেকির মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের মানুষ চলে যাওয়া নয়, বরং গোটা একটা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পণের লোভে তরতাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এই প্রবণতা রুখতে কঠোর আইনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও একান্ত প্রয়োজন। মৃতার পরিবার এখন দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়েকে পণের বলি হতে না হয়।
বেঙ্গালুরু পুলিস জানিয়েছে, তদন্ত দ্রুত গতিতে চলছে এবং সমস্ত তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখে খুব শীঘ্রই আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে। অকাল প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর সহকর্মী ও পরিচিত মহলে।
(Feed Source: zeenews.com)
