জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ফেলে আসা ২০২৫ সালকে যুদ্ধের বছর বললে ভুল হবে না। তীব্র সশস্ত্র সংঘাতে মেতেছিল ইরান-ইসরায়েল, রাশিয়া-ইউক্রেন ও ভারত-পাকিস্তান। বিশ্ব দেখেছে সুদান গৃহযুদ্ধ, মায়ানমার গৃহযুদ্ধ, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষ। এছাড়াও সিরিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো এবং সাহেল অঞ্চলের দেশগুলিতে (মালি, বুর্কিনা ফাসো ও নাইজার) বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলেছিল। আর এবার কি চিন-তাইওয়ান যুদ্ধ (China vs Taiwan War) আসন্ন? লাল ড্রাগনের দেশের রক্তচক্ষু সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
তাইওয়ান জানিয়েছে যে, বুধবার ২৯ এপ্রিল, স্থানীয় সময় ভোর ৬টার দিকে তাদের জলসীমার আশেপাশে চিনের ১০টি এয়ারক্রাফ্ট ও ১১টি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি তাদের নজর এড়ায়নি তাইওয়ানের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (এমএনডি) এক্স পোস্টে জানিয়েছে, ‘আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত তাইওয়ানের আশেপাশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ১০টি যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন, পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির ১১টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১টি সরকারি জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই ১০টির মধ্যে ৯টি বিমান তাইওয়ান প্রণালীর মধ্যরেখা (মিডিয়ান লাইন) অতিক্রম করে তাইওয়ানের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের এয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোনে (এডিআইজেড) ঢুকে পড়েছিল। পরিস্থিতি নিবিড় ভাবে নজরদারি করেছে রিপাবলিক অব চায়না সশস্ত্র বাহিনী এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর আগে গতকালও তাইওয়ান তার চারপাশে চিনের ২২টি সামরিক বিমানের উড্ডয়ন এবং ৯টি যুদ্ধজাহাজ শনাক্ত করেছিল। ওই ২২টির মধ্যে ২০টি বিমান মধ্যরেখা অতিক্রম করে তাইওয়ানের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এডিআইজেডে ঢুকেছিল।
চিন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবেই দাবি করে আসছে। ইতিহাস, রাজনীতি এবং আইনি ব্যাখ্যার জটিল মিশ্রণে রয়েছে যার শিকড়। তাইওয়ানের বিষয়টি চিন তাদের জাতীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক বিবৃতিতেও এই অবস্থান তুলে ধরা হয়। তাইওয়ান নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখে কার্যত একটি স্বশাসিত সত্তা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী এবং শক্তিশালী অর্থনীতি রয়েছে, যা তাকে বাস্তবে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেয়। তাইওয়ানের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক আঙিনাতে এখনও বিতর্ক রয়েছে। এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো—যেমন সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি, এসবকেই চ্যালেঞ্জ জানায়। ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়ার মতে এই ইস্যু বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়।
দেখতে গেলে তাইওয়ানের উপর চিনের দাবির উৎস নিহিত রয়েছে ১৬৮৩ সালে চিং রাজবংশের হাতে মিং রাজবংশের অনুগত সেনাপতি কোক্সিংগার পরাজয় এবং এর পরপরই দ্বীপটিকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করার ঘটনায়। তবে, চিং শাসনের অধীনে তাইওয়ান মূলত একটি প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল এবং এর উপর চিং কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিল সীমিত। ১৮৯৫ সালে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। প্রথম চিন-জাপান যুদ্ধের পর চিং রাজবংশ তাইওয়ানকে জাপানের কাছে হস্তান্তর করে দেয়। এর ফলে পরবর্তী ৫০ বছর তাইওয়ান জাপানের একটি উপনিবেশ হিসেবে শাসিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর তাইওয়ান পুনরায় চির নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, কিন্তু এই সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক বে সম্পন্ন বা স্বীকৃত হয়নি। ১৯৪৯ সালে চিনের গৃহযুদ্ধের ফলে মূল ভূখণ্ডে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের(পিআরসি) তৈরি হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী চিন তাইওয়ানে সরে যায় এবং সমগ্র চিনের ওপর শাসনভারের দাবি বজায় রাখে। এর ফলে দ্বৈত সার্বভৌমত্বের দাবির উদ্ভব ঘটে। মূল ভূখণ্ডের উপর পিআরসি-রতাইওয়ানের ওপর আরওসি-র। তাইওয়ান কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে পিআরসি-র সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে তারা আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থেকেছে।
(Feed Source: zeenews.com)
