
প্রয়াত চিকিৎসক ডক্টর দীপক গুপ্তর মৃত্যুর পর তাঁরই মেয়ে ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত প্রত্যন্ত আন্দারথোল গ্রামে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন। বাবার খালি চেয়ারে বসে টর্চের আলোয় আবারও অসহায় মানুষের চিকিৎসা শুরু করে মানবসেবার সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি।
বাবার পথেই চিকিৎসক কন্যা
বাঁকুড়া, নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে চিকিৎসা করতেন ডক্টর দীপক গুপ্ত। সেই মানবসেবা থমকে যায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় কিন্তু সেই আলো নিভে যেতে দেননি তাঁরই মেয়ে। বাবার স্বপ্ন, বাবার চেয়ার, বাবার অসমাপ্ত কর্মযজ্ঞ, সবকিছুকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে তুলে নিয়ে শুক্রবার থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত। বাঁকুড়া জেলার প্রত্যন্ত আন্দারথোল গ্রামে, ঠিক যেখানে তাঁর বাবা বসতেন সেখানেই অন্ধকারে আবারও জ্বলে উঠেছে আশার আলো, টর্চের আলোয় আবার শুরু হয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা।
প্রয়াত ডক্টর দীপক গুপ্ত ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল অফিসার। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই চিকিৎসকের চেম্বার ছিল বাঁকুড়ার কেন্দুয়াডিহিতে। এছাড়াও সপ্তাহে তিনদিন করে কমলপুর ও গোবিন্দধামে রোগী দেখতেন তিনি। চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি মানবিকতা ও সমাজসেবামূলক কাজের জন্যও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। অন্যদিকে, তাঁর মেয়ে ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত বর্তমানে নতুনগ্রামে এবং বাড়িতেই চেম্বার করে রোগী দেখছেন। প্রায় চার বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শ্রুতি মেদিনীপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন এবং বাবার আদর্শ অনুসরণ করে চিকিৎসা পরিষেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
বিশিষ্ট চিকিৎসক ডক্টর দীপক গুপ্ত বেশ কয়েক বছর ধরে সপ্তাহে একদিন করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে আসছিলেন প্রত্যন্ত আন্দারথোল গ্রামে। বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় গ্রামের অন্ধকারে কখনও মুঠোফোনের আলোয়, কখনও টর্চ জ্বালিয়ে চিকিৎসা করেছেন অসহায় মানুষদের। শুধু চিকিৎসাই নয়, দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ, রক্তপরীক্ষা থেকে শুরু করে মানবিক সহায়তার প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অসামান্য ভূমিকা। ‘আলোর দিশা কর্মযোগ’ নামের সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার কর্মযোগের আদর্শকে সামনে রেখেই চলত এই সেবা।
ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত জানান, “আট বছর বাবার সঙ্গে কাজ করেছি। পুরোটাই শিখেছি বাবার কাছে। সেই জন্য বাবার পথ অনুসরণ করছি।” কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শনিবার গভীর রাতে ছাতনা থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ডক্টর দীপক গুপ্ত। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে আন্দারথোল গ্রামজুড়ে। বহু গ্রামবাসীর কাছে তিনি শুধু চিকিৎসক ছিলেন না, ছিলেন ভরসার অন্য নাম। অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁর চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের অসুস্থতা কাটিয়ে নতুন জীবনে ফিরেছিলেন বহু মানুষ। তাই তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলেই মনে করছিলেন সকলেই। কিন্তু ঠিক সেই সময় বাবার পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন মেয়ে ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত।
বাবার সেই একই চেয়ারে বসে, একই নিষ্ঠা আর মানবিকতা নিয়ে এখন তিনিই পৌঁছে যাচ্ছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। টর্চের আলোয় আবার চলছে চিকিৎসা, ফিরছে মানুষের মুখে হাসি। গ্রামবাসীদের কথায়, “ডাক্তারবাবু নেই, কিন্তু তাঁর আলো এখনও জ্বলছে মেয়ের হাত ধরে।” বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ডক্টর শ্রুতি গুপ্ত যেন আজ মানবসেবার এক নতুন দৃষ্টান্ত।
